আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীর খ্রিস্ট বিশ্বাস গ্রহণের গৌরবময় ১২০ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপন
গত ২৮ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত আন্ধারকোঠা নিত্য সাহায্যকারিনী মা-মারীয়ার ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হলো ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠার ১২০ বছর পূর্তি উদযাপন।
এই দিবসকে কেন্দ্র করে মূলসুর হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল, “মিলনান্দে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা”। এতে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও, ধর্মপল্লীর পাল- পুরোহিত ফাদার প্রেমু টি. রোজারিও সহ ২৪ জন ফাদার, ২ জন ব্রাদার, ২৫ জন সিস্টার, ১৪ জন সেমিনারিয়ান এবং কারিতাস রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আরোক টপ্য।
এছাড়াও ধর্মপল্লীর বিভিন্ন গ্রাম থেকে আগত প্রায় ছয় শতাধিক খ্রিস্টভক্ত উপস্থিত ছিলেন। পূর্তি উৎসবের পূর্বের দিন আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীর খ্রিস্টভক্তগণ আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিস্বরুপ সাক্রামেন্তীয় আরাধনা করেন।
ধর্মপল্লীর এই পূর্তি উৎসবের খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন বিশপ জের্ভাস রোজারিও এবং অন্যান্য যাজকগণ সহার্পিত খ্রিস্টযাগ অংশগ্রহণ করেন।
খ্রিষ্টযাগের উপদেশ বাণীতে বিশপ জের্ভাস রোজারিও বলেন, “আজ থেকে ১২০ বছর পূর্বে পিমে মিশনারীদের দ্বারা এ অঞ্চলে খ্রিস্টবিশ্বাসের বীজ রোপিত হয়েছিল। আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লী রাজশাহীর প্রায় ধর্মপল্লীর মাতা তাই একে বলা হয় মাতৃ ধর্মপল্লী।”
বিশপ আরো বলেন, “খ্রিস্টজুবিলী বর্ষে ১২০ বর্ষপূর্তি উৎসব আমাদেরকে আধ্যাত্মিক ভাবে ধর্মপল্লীর ১২৫ বছরে জুবিলী পালন করার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। এই বছর আমরা পালন করছি যিশুখ্রিস্টের জন্মের ২০২৫ বছরের জুবিলী। আর প্রয়াত পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস মূলসুর হিসেবে বেছে নিয়েছে 'আশার তীর্থযাত্রী'।”
“এ পৃথিবীতে আমরা সবাই স্বর্গে যাওয়ার জন্য আশার তীর্থযাত্রী। আমাদের অনেক আশা থাকতে পারে তবে স্বর্গে যাওয়া হলো প্রধান লক্ষ্য। আমরা যদি স্বর্গে যেতে না পারি তবে আমাদের যিশুর সেই বাণী স্মরণ করতে হয় “সমস্ত জগত লাভ করে কি লাভ যদি নিজের আত্মাকে হারাও”। তাই আমি আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীর খ্রিস্টভক্তদের অনুরোধ করি নিজেদের মূল্যায়ন করুন এবং খ্রিস্টবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যান,” বলেন বিশপ রোজারিও।
খ্রিস্টযাগের পর ১২০ বছরের স্মৃতিফলক উন্মোচন ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ে ফাদার কার্লো বুজ্জি পিমে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “উত্তরবঙ্গে খ্রিস্টবাণী প্রচারে পিমে ফাদারদের অবদান অবিস্মরণীয়। প্রথমদিকে পিমে ফাদার ও মারিয়া বাম্বিনা সিস্টারগণ উত্তরবঙ্গে বাণী প্রচারে অনেক পরিশ্রম করেছেন। প্রথমে পিমে ফাদারগণ নানারোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রথমদিকে ২৬জন মারিয়া বাম্বিনা সিস্টার ও ১০ জন পিমে ফাদার মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।”
ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত ফাদার প্রেমু রোজারিও বলেন, “আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীর মাটি পবিত্র কারণ এ মাটিতে শহীদ ফাদার আঞ্জেলা মাজ্জনী শহীদ হন এবং অনেক ফাদার মৃত্যুবরণ করেন। এ আয়োজন সার্থক করতে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের সকলকে অনেক ধন্যবাদ।”
আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীর একজন খ্রিস্টভক্ত স্পেরাতুস বিশ্বাস তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আজ ১২০ বছর পূর্তিতে আমি অনেক আনন্দিত কারণ এখানেই উত্তরবঙ্গে প্রথম খ্রিস্টান হয়েছিল। এখান থেকে অনেক ধর্মপল্লী হয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে যারা সবাই আজ স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত।”
রাজশাহী কারিতাসের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আরোক টপ্য বলেন, “আমরা রাজশাহী কারিতাস আনন্দিত কারণ এখান থেকেই কারিতাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজকের দিনে ধর্মপল্লীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।”
উল্লেখ্য যে, একশত বিশ বছর পূর্তি ঈশ্বরের এক মহাশীর্বাদ। ইটালী থেকে আগত পিমে মিশনারী ফাদারগণ আন্ধারকোঠাতে প্রথম পাহাড়িয়া আদিবাসীদের দীক্ষা দিয়ে এখানে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ধর্মপল্লী স্থাপন করেছিলেন।
পরিশেষে মিলনান্দে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১২০ বছর পূর্তি উৎসব সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। - ডানিয়েল লর্ড রোজারিও