দিয়াং মরিয়ম আশ্রমে উদযাপিত হলো মা- মারিয়ার তীর্থোৎসব
গত ২৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, চট্টগ্রাম কাথলিক আর্চডাইয়োসিসের অন্তর্গত দিয়াং মরিয়ম আশ্রমে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো মা- মারিয়ার তীর্থোৎসব।
এই বছর মা মারিয়ার তীর্থোৎসবের মূলসুর ছিল, মারিয়ার বলে উঠলেন, “আমার অন্তর গেয়ে ওঠে প্রভূর জয়গান”। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত হাজার হাজার তীর্থযাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
তীর্থের আগের দিন বিকালে পবিত্র খ্রিস্টযাগের পরে শুরু হয় পবিত্র সাক্রামেন্তের আরাধনা, নিরাময় ও পুনর্মিলন অনুষ্ঠান।
এরপর দিয়াং এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রোজারি মালা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তীর্থযাত্রীরা আলোক শোভাযাত্রা করেন।
তীর্থের মহাখ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন আর্চবিশপ সুব্রত হাওলাদার, সিএসসি। তিনি তার উপদেশ বাণীতে বলেন. “আজ থেকে প্রায় পাঁচশত বছর আগে প্রভূ যীশু বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এই দিয়াং এর মধ্য দিয়ে। পর্তুগিজগণ এই দিয়াং এর মাটিতে প্রভূ যীশুকে নিয়ে এসেছেন।”
আর্চবিশপ হাওলাদার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভ্যাটিকানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ কোচেরির কথা উল্লেখ্য করে বলেন, এই দিয়াং হচ্ছে বাংলাদেশের বেথলেহেম। কারণ এই বেথলেহেম থেকে যীশু খিস্ট পৃথিবীতে প্রবেশ করেছেন আর এই দিয়াং থেকে যীশু বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন।”
তিনি আরো বলেন, “এখান থেকেই যীশুকে নিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। তাই তো এই দিয়াং হয়ে উঠেছে বিশ্বাসের তীর্থভূমি। আর এখান থেকে যারা যীশুকে অন্তরে গ্রহণ ও ধারণ করেছেন তাদের মধ্যে প্রায় ছ’শত জন নর-নারী বিশ্বাসের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের রক্তে এই ভূমি হয়ে উঠেছে পূর্ণ পবিত্র ।”
“তাই আমাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে আমরা বার বার এই তীর্থ ভূমিতে ফিরে আসি কারণ এখানেই আমাদের শুরু এখানেই আমাদের বিশ্বাসের নবায়ণ,” বলেন আর্চবিশপ।
তিনি আরো বলেন, “মা-মারীয়ার দিকে তাকালে আমরা দেখি তার জীবন ঈশ্বরের গভীর ভালবাসায় পূর্ণ ছিলো। আর তা আমরা পাই তাঁর প্রসংশাগীতিতে যেখানে বলা হয়েছে, আমার অন্তর গেয়ে উঠে প্রভূর জয়গানে। আর সত্যিই সবসময় মারীয়ার অন্তর প্রভূর জয়গানে মুখরিত ছিল। কারণ মারীয়ার তার জীবনে উপলব্দি করেছেন যে ঈশ্বর তাঁর জন্য কত মহান কাজই না করেছেন।”
“আমাদের ব্যক্তি জীবনে ঈশ্বর যে মহান কাজ করছেন তার জন্য আমরা আনন্দ করব এবং ধন্যবাদ দিব। আর আমি আহ্বান করি আমরা যেন ভালবাসার সাক্ষ্য দিতে এবং সেবার সাক্ষ্য দিতে মা-মারীয়ার সাথে সময় কাটাতে প্রতিবছর এখানে এই তীর্থ উৎসবে যোগদান করি এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করি,” বলেন আর্চবিশপ হাওলাদার।
আর্চবিশপ আরো বলেন, “মা-মারিয়ার সাথে এক মন এক প্রাণ হয়ে আমরা বলি আমার অন্তর গেয়ে ওঠে প্রভূর জয়গানে এই প্রার্থনা পুত্র ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করি।”
তীর্থে অংশগ্রহণকারী একজন মারীয়া ভক্ত তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি প্রতি বছর দিয়াং এর মা মারিয়ার নিকট গভীর বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে প্রার্থনা করতে আসি কারণ আমি অসুস্থ ছিলাম কিন্তু মায়ের মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করে সুস্থতা লাভ করেছি তাই মা মারিয়াকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি।”
উল্লেখ্য, ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে পর্তুগিজ বণিকদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গে খ্রিষ্টবিশ্বাসেরও আগমন ঘটে। ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পর্তুগিজ বণিকেরা চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এরপর ১৫৯৮ সালে দক্ষিণ ভারতের কোচিন থেকে বাংলায় প্রথম মিশনারিরা আসেন।
প্রথম মিশনারি জেজুইট ধর্মসংঘের পুরোহিত ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ দিয়াং পূর্ববঙ্গের প্রথম গির্জা নির্মাণ করেন ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পাথরঘাটা বান্ডেল রোড ও জামালখানে দুটি গির্জা নির্মাণ করেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৯৭৬ সালের বড়দিনের পূর্বদিন চট্টগ্রাম জেলার দিয়াং-এ মরিয়ম আশ্রম চালু হয়। কিন্তু এ চিন্তাধারাটির সূত্রপাত হয় বিশ বছর পূর্বে যখন দিয়াং অনাথাশ্রমের কয়েকজন ছেলে ফাদার ফিলিপ পায়াকে তাদের গুরু হিসেবে নিয়ে একটি আশ্রম খোলার আশা পোষণ করে। কিন্তু ফাদার পায়া ভারতে বদলী হয়ে যান এবং মাদুরাই জেলার পালানিতে একটি আশ্রম খুলেন।
পরবর্তীতে ব্রাদার ফ্লাভিয়ান লাপ্লান্তে সি,এস,সি স্বদেশে (ক্যানাডায়) ছুটি কাটিয়ে দিয়াং-এ ফিরে এসে পাহাড়ের মধ্যে নিজের বাসস্থানসহ একটি প্রার্থনা-কেন্দ্র স্থাপন করেন। এ প্রার্থনা-কেন্দ্রে ঈশ্বরের উপাসনা করার জন্য জনগণকে আহ্বান জানানো হয়।
পরে ১৯৪৫ সালে অনাথাশ্রমের গোড়া পত্তন থেকেই ধন্যা কুমারী মারিয়ার প্রতি ভক্তির নিদর্শন চলে আসছে। এর ফলস্বরূপ লুর্দের রাণী ধন্যা কুমারী মারিয়ার একটি 'গ্রটো' বা গুহা দিয়াং-এ নির্মাণ করা হয়েছে।
খ্রীষ্টান-অখ্রীষ্টান সবার কাছেই ধন্যা মারীয়ার বিশেষ আবেদন আছে। সবাই এখানে এসে ঈশ্বর ও মারিয়ার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করতে পারেন। - আরভিএ সংবাদ