জয়পুরহাট নতুন ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ হিসেবে ফাদার পল গমেজের বিশপীয় অভিষেক লাভ
গত ৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, জয়পুরহাট নতুন ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত বেণীদুয়ার ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হলো ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ হিসেবে ফাদার পল গমেজের বিশপীয় অভিষেক অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত নতুন এবং বাংলাদেশের নবম ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন বিশপ গমেজ। এই ধর্মপ্রদেশে সাঁওতাল, উঁরাও, মুন্ডারী, মাহালী, পাহান, কুর্মী, রবিদাস, মাহাতো, তুরী, বর্মণ ও কোচ আদিবাসীদের বসবাস।
এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসীই খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে অবগত নন। ধর্মপ্রদেশের অধীনে তেরটি ধর্মপল্লী ও মিশনকেন্দ্র যে খ্রিস্টবিশ্বাসের আলোকে সমৃদ্জ্জিত রাখবে তা নির্দিয়ায় বলা যায়।
এই অনুষ্ঠিত অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভাটিকানের রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ কেভিন এস. রাণ্ডাল, ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ, রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও।
এছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্মপ্রদেশের বিশপগণ, নাটোর ও নওগাঁ জেলার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ্, ফাদার, সিস্টার, ব্রাদার ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিস্টভক্তগণ।
এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আগের দিন বিকালে বিশপ পল গমেজের মঙ্গলকামনায় অভ্যর্থনা, পবিত্র আরাধনা ও মঙ্গলানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিশপ, ফাদার, সিস্টার এবং বিশপ পল গমেজের আত্মীয়-স্বজনগণ বিশপের মঙ্গলকামনায় প্রার্থনা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।
পবিত্র খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে এই বিশপীয় অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অভিষেককারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিশপ জের্ভাস রোজারিও, সহ-অভিষেককারী আর্চবিশপ কেভিন এস. রাণ্ডাল এবং সহ-অভিষেককারী আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ,ওএমআই।
পবিত্র খ্রিস্টযাগের উপদেশ বাণীতে বিশপ ইম্মানুয়েল কানন রোজারিও বলেন, “ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন ও যত্ন করেন তা আজকে এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। পুণ্যপিতা চতুর্দশ লিওকে ধন্যবাদ জানাই যিনি নতুন একটি ধর্মপ্রদেশ ও নতুন ধর্মপাল হিসেবে পল গমেজকে দান করেছেন। বিশপীয় দায়িত্ব একাকী লাভ করা যায় না, বরং ঈশ্বর ভালোবেসে এই পালকীয় দায়িত্ব প্রদান করেন।”
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভাটিকানের রাষ্ট্রদূত ক্যাভিন এস. রাণ্ডাল নব অভিষিক্ত বিশপ পল গমেজকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “বিশপ পল বাংলাদেশ মণ্ডলীর জন্য আশির্বাদস্বরূপ। তিনি জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের ভক্তবিশ্বাসীদের ঐশরাজ্যের দিকে পরিচালিত করবেন। এছাড়াও সকল ধর্মের মানুষের সাথে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে সিনোডালিটি প্রতিষ্ঠা করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”
রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “বিশপ পল গমেজ একজন যোগ্য যাজক ছিলেন। আর ঈশ্বর তাঁর এই যোগ্য যাজককে বিশপ হওয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন। আজকে জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ মণ্ডলীও অত্যন্ত আনন্দিত।”
তিনি আরও বলেন, “বিশপ পল গমেজের জন্য আমাদের প্রার্থনা খুবই দরকার। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনি জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশ তথা জনগণকে ঈশ্বরের পথে সুন্দরভাবে পরিচালিত করবেন।”
নব অভিষিক্ত বিশপ পল গমেজ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি আজ প্রথমেই ঈশ্বরকে ও পোপ চতুর্দশ লিও'কে ধন্যবাদ জানাই আমাকে এই গুরুদায়িত্ব প্রদান করার জন্য। একই সাথে আমি রাজশাহীর বিশপ, অন্যান্য বিশপ, ও সর্বস্তরের জনগনকে ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি আরো বলেন, “আমি অযোগ্য থাকা সত্ত্বেও ঈশ্বর তাঁর কাজের জন্য আমাকে বেছে নিয়েছেন। আমার বিশপীয় জীবনে আপনাদের সমর্থন ও প্রার্থনা অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনাদের প্রার্থনার গুণে ও সহযোগীতায় জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের সার্বিক উন্নয়ন হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।”
নবগঠিত জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের কাথিড্রাল হিসেবে জেলা শহর খঞ্জনপুরের মা মারীয়া আমাদের সহায় ধর্মপল্লীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
পবিত্র খ্রিস্টযাগের পর ছিলো নবাভিষিক্ত বিশপ পল গমেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। নৃত্য ও গানে বিশপকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। এছাড়াও ছিলো বিশপীয় অভিষেক স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন। এছাড়াও আরো ছিলো বিভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতির সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সাঁন্তালী কনসার্ট।
এর আগে ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, পূণ্যপিতা পোপ চতুর্দশ লিও নতুন ধর্মপ্রদেশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট’কে নতুন ধর্মপ্রদেশ হিসেবে এবং সেখানে বিশপ হিসেবে পল গমেজ এর নাম ঘোষণা করেছিলেন।
বিশপ পল গমেজ এর জন্ম রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের মথুরাপুর ধর্মপল্লীর খরবাড়িয়া গ্রামে ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে। তার পিতা-মাতার নাম স্বর্গীয় বানার্ড গমেজ ও স্বর্গীয়া পেরপেতুয়া কস্তা।
তিনি ডিকন পদে অভিষেক লাভ করেন ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে আর ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিশপ প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও কর্তৃক যাজকীয় অভিষেক লাভ করেন। বিশপ পদে মনোনয়ন লাভ করেন ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ আর বিশপ পদে অভিষেক লাভ করেন ৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ।
৬৪ বছর বয়স্ক নতুন বিশপ পল গমেজ তার পালকীয় জীবনে সুরশুনিপাড়া, বেনীদুয়ার, বোর্নী, রাজশাহী কাথিড্রাল ধর্মপল্লীতে কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি যীশুনাম গৃহ সুইহারী দিনাজপুরে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯৮-২০০০ পর্যন্ত ফিলিপাইনের সান্তো টমাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন।
এছাড়াও তিনি রমনা সেমিনারীতে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এবং বনানী মেজর সেমিনারীতে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন ২০২২ থেকে আর এখন এই দায়িত্বে বহাল আছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে বগুড়া জেলা থেকে বিভক্ত হয়ে জয়পুরহাট পৃথক জেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের অধীন ছোট্ট একটি জেলা এই জয়পুরহাট।
২১ মে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশ থেকে পৃথক হয়ে রাজশারী ধর্মপ্রদেশের যাত্রা শুরু। কালের পরিক্রমায় কেটে গিয়েছে ছত্রিশটি বছর। সময়ের চাহিদা, দূরত্ব ও পালকীয় সেবাদানের সুবিধার্থে পোপ চতুর্দশ লিও ২৫ মার্চ জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশ ঘোষণা করেছেন।
জয়পুরষাট, বগুড়া এবং নওগাঁ জেলার অধীনস্থ ধর্মপল্লীগুলো এতদিন রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত ছিলো। এখন নবঘোসিত জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশ যোষণা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও মহাকরুণা।- আরভিএ সংবাদ