রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের নবাই বটতলা ধর্মপল্লীতে উদযাপিত হলো রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব

নবাই বটতলা ধর্মপল্লীতে উদযাপিত হলো রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব

আজ ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,  রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত নবাই বটতলা ধর্মপল্লীতে উদযাপিত হলো রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব।

এই তীর্থোৎসবকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টভক্তদের আধ্যাত্নিক প্রস্তুতি স্বরুপ নয় দিনের নভেনা প্রার্থনা, পবিত্র খ্রিস্টযাগ, পাপস্বীকার সংস্কার ও মানত দানের মাধ্যমে বহুসংখ্যক মারীয়া ভক্তবিশ্বাসী এই তীর্থোৎসব যোগদান করে।

এই তীর্থোৎসবকে কেন্দ্র করে আগের দিন সন্ধ্যায় আলোক শোভাযাত্রা, মা মারীয়ার ওপর আলোচনা এবং পবিত্র সাক্রামেন্তীয় আরাধনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভক্তবিশ্বাসীরা রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার নিকট শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ তীর্থোৎসবে দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের বিশপ সেবাস্টিয়ান টুডু সহ হাজার হাজার মারীয়া ভক্তবিশ্বাসী, ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টারগণ অংশগ্রহণ করেন।

নবাই বটতলা রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসবে অংশগ্রহনকারীগণ

তীর্থের খ্রিস্টযাগে প্রধান পৌরহিত্য করেন দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের বিশপ সেবাস্টিয়ান টুডু। বিশপ সেবাস্টিয়ান টুডু খ্রিস্টযাগের উপদেশ বাণীতে বলেন, “আমি প্রথমেই আপনাদের ধন্যবাদ জানাই, যারা অন্তরে ভক্তি ও গভীর বিশ্বাস নিয়ে এই তীর্থে যোগদান করেছেন এবং মায়ের মধ্যস্থতায় আশীর্বাদ লাভ করছেন। নবাই বটতলাবাসী সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচানোর জন্য মা মারীয়ার নিকট ভরসা করেছিলেন। আর মা মারীয়া ঠিকই তাঁর স্নেহের আঁচলে ভক্তবিশ্বাসীদের রক্ষা করেছেন।”

তীর্থভূমির মধ্য দিয়ে ঈশ্বর তাঁর করুণা ও আশীর্বাদ উজাড় করে দেন,  আর তীর্থযাত্রীরা বিশ্বাস, ভক্তি ও প্রত্যাশা নিয়ে তীর্থযাত্রা করে সেই অনুগ্রহ লাভে ধন্য হন। তীর্থযাত্রা মূলত একজন খ্রিস্টবিশ্বাসীর জীবন্ত বিশ্বাসের প্রকাশ-যেখানে হৃদয়ের গভীর ভক্তি, আশা ও আকাঙ্ক্ষা মিলিত হয়ে ঈশ্বরের একান্ত সান্নিধ্য ও নিকটতা লাভের ব্যাকুলতা সৃষ্টি করে। এই ব্যাকুলতা থেকেই জন্ম নেয় মিলন উৎসব,  আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার,” বলেন বিশপ টুডু।

বিশপ আরো বলেন, “নবাই বটতলা রক্ষাকারিণী মা-মারীয়ার তীর্থভূমিও তেমনই এক অনন্য আশীর্বাদের স্থান। এই পবিত্র ভূমিতে ঈশ্বর তাঁর ভক্তবিশ্বাসীদের ওপর করুণা বর্ষণ করে চলেছেন রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার মধ্যস্থতায়। এই তীর্থোৎসবে যোগদান করার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অন্তরকে পবিত্র করে তুলছি। আর মা মারীয়ার সাথে আমাদের আধ্যাত্নিক বন্ধন দৃঢ় করে তুলছি।”

রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব

সুন্দর ও প্রার্থনাপূর্ণ আয়োজনের জন্য রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের ভিকার জেনারেল ফাদার ফাবিয়ান মারান্ডী সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

নবাই বটতলা ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ফাদার স্বপন পিউরিফিকেশন মা মারীয়ার নিকট গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “প্রতি বছরের ন্যায় এই বছরও আমরা আমাদের স্বগীয় মা,  রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থ সুন্দর ও স্বার্থকভাবে সমাধা করতে পেরেছি বলে প্রথমত পিতা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই।”

তিনি আরো বলেন, “আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রকাশ করে আমরা সত্যিকার অর্থেই সিনোডাল মণ্ডলির পথেই যাত্রা করছি। কারণ আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আশীর্বাদিত অনুষ্ঠান আরো বেশি প্রানবন্ত ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে । স্বর্গের মা মারীয়া আমাদেরকে স্বর্গের পথে পরিচালিত করুন আর রক্ষাকারিণী মা মারীয়া আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করুন এই প্রত্যাশা করি।” 

নবাই বটতলা গ্রামের নারী নেত্রী ও সমাজকর্মী কস্তানতিনা হাঁসদা বলেন, “সেই ১৯৭১ সাল থেকে আমরা এই রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব পালন করছি কারণ এই মায়ের মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করে সেইদিন আমাদের গ্রামবাসী সবাই পাক-বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। তাই মা মারীয়াকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে আমরা প্রতি বছর এই তীর্থ করে থাকি।”

নবাই বটতলা ধর্মপল্লীতে উদযাপিত হলো রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব

তীর্থে অংশগ্রহনকারী  টমাস কস্তা বলেন, “ বছর তীর্থোৎসব যথেষ্ট ভক্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ ছিল। আমি রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার কাছে প্রার্থনা ও মানত করেছি,  বিশ্বাস করি তিনি আমাকে সাহায্য করবেন ও আশীর্বাদ করবেন।”

নবাই বটতলা রক্ষাকারিণী মা-মারীয়ার তীর্থস্থানটি রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের একটি অন্যতম তীর্থস্থান যেখানে খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলিম সকলেই তীর্থ করতে আসে। নবাই বটতলা রক্ষাকারিণী মা-মারীয়ার তীর্থস্থান একটি সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম। তবে এই গ্রামে কিছু সংখ্যক উড়াও পরিবারও রয়েছে। এই তীর্থস্থানটি বরেদ্রের তীর্থস্থান নামেও বেশ পরিচিত।

নবাই বটতলা রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব বাংলাদেশ মণ্ডলীর জন্য একটি আশীর্বাদ। ভক্তের প্রার্থনা ও বিশ্বাসের  ফলে এ উৎসব দিনে দিনে আরো বিস্তার লাভ করছে।

দূর-দুরান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও খ্রিস্টভক্ত এসে মিলিত হয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং মাতা মারীয়ার নিকট তাদের বিশ্বাসের মানত ও প্রার্থনা নিবেদন করেন।

এছাড়াও ভক্তবিশ্বাসীদের আগমন ও তীর্থের কলেবর প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী বছর আরো বৃদ্ধি পাবে এই প্রত্যাশা করি। - আরভিএ সংবাদ