কাক্কো’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ১ম সিইও ওয়ার্কশপ, ১৫তম বার্ষিক সাধারণ সভা ও ৭ম ওপেন ফোরাম
গত ১৩ থেকে ১৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দি সেন্ট্রাল এসোসিয়েশন অব খ্রিস্টান কো-অপারেটিভস্ (কাককো) লিমিটেড আয়োজিত ১ম সিইও ওয়ার্কশপ, ১৫তম বার্ষিক সাধারণ সভা ও ৭ম ওপেন ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়েছে ।
এই অনুষ্ঠানের মূলসুর ছিল “স্থিতিশীল আর্থিক সমবায় গঠনে রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব ও মানদন্ড”। এতে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে আগত প্রায় ১৫১ জন চৌকষ সমবায় নেতৃবৃন্দরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ।
এবারের সিইও ওয়ার্কশপ, ফোরাম ও বার্ষিক সাধারণ সভা পৃথিবীর সুবিশাল সমুদ্র সৈকতের লীলাভূমি কক্সবাজার-এর হোটেল সী প্যালেস-এ অনুষ্ঠিত হয় ।
১ম দিন সিইও ওয়ার্কশপে সমবায় সেক্টরের প্রফেসনাল নেতৃত্বের মানোন্নয়নে সমবায়ের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ, সিইও’র দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং বিশ্বের মহান সিইও জ্যাক ওয়েলচ থেকে ২৪টি শিক্ষা, লিডারশীপ বুটক্যাম্প ও সিইওদের বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের যুগে এআই ব্যবহারের উপর নান্দনিক উপস্থাপনা ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা হয় ।
ওয়ার্কশপে বিভিন্ন সমবায় সমিতি হতে ৭৪ জন এক্সিকিউটিভ নেতৃবৃন্দ যোগদান করেন । ওয়ার্কশপটি সিইওদের নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা শেয়ারিং ও নেটওয়ার্কবৃদ্ধির একটি অনন্য প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে ।
কাক্কো’র চেয়ারম্যান মিঃ টুটুল পিটার রড্রিকস্-এর সভাপতিত্বে ১৩ মার্চ বিকাল ১৫তম বার্ষিক সাধারণ সভা আরম্ভ হয় । সদস্য সমিতির ৩১ জন ডেলিগেট ও ৪৬ জন অবজারভার এতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ।
আলোচ্যসূচী মোতাবেক কাক্কো লিঃ-এর ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন অর্জন, চলমান কার্যক্রমসমূহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থাপন করা হয় ।
কাক্কো’র এবছরের সম্পদ-পরিসম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮.০৪% এবং লভ্যাংশ প্রদান করা হয়েছে ১০.৫০% । এ অর্জনে উপস্থিত ডেলিগেটবৃন্দ কাক্কো নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনসহ ভূয়শী প্রশংসা করেন ।
পরবর্তীতে ১৪ মার্চ সকালে ১৫১ জন সমবায়ী নেতৃবৃন্দ ও প্রফেশনালদের অংশগ্রহণে ৭ম ওপেন ফোরাম আরম্ভ হয় ।
বাংলাদেশের সমবায়ে বিশ্বমানের নেতৃত্ব গুণাবলি অর্জন ও নেতৃবৃন্দকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে হাই রোড লিডারশীপ বিষয়ের উপর ভার্চুয়ালি অত্যন্ত চমৎকার, উৎসাহমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনা প্রদান করেন আকু’র সিইও মিস্ এলিনেটা ভি. সানরেক ।
ইন্দেনেশিয়ার সমবায় অভিজ্ঞতা শেয়ারিং এবং ক্রেডিট ইউনিয়নের আর্থিক ও ম্যানেজমেন্ট-এর আদর্শমান ACCESS ও CULEG সম্পর্কে বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা প্রদান করেন মিস্ রোজালিনা সুসি, সিইও, PUSKOPCUINA এবং ফাদার ড. ফ্রেডী রান্তে তারুক, এ্যডভাইজার, Credit Union Sauan Sibarrung ।
এছাড়াও সমবায়ে নেতৃবৃন্দের যোগ্যতা পরিমাপে আকু প্রবর্তিত ফিট অ্যান্ড প্রপার মূল্যায়ন, কাক্কো’র কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২৫-২০৩০), ব্রেকআউট সেশন প্লেনারি: সেরা সমবায় চর্চা, জলবায়ু সুরক্ষায় কার্যক্রম, ডিজিটালাইজেশন, যুব ও নারী বিষয়ক আলোচনা, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা সহভাগিতা, সমবায় সমিতির মূলধন সুরক্ষায় মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, টেকসই সমবায় গঠনে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা’র উপর নান্দনিক উপস্থাপনা ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা হয় ।
ফোরামে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি ৩টি সমবায় সমিতির বেস্ট প্র্যাকটিস উপস্থাপনা, প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন ও নিজেদের মধ্যে শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ওপেন ফোরামটি জ্ঞান অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরী করেছে ।
এজিএম ও ফোরাম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন জনাব মোঃ নবীরুল ইসলাম, অতিরিক্ত নিবন্ধক (প্রশাসন, মাসউ ও ফাইন্যান্স), সমবায় অধিদপ্তর, ঢাকা ।
শুভেচ্ছা বক্তেব্য তিনি বাংলাদেশে বর্তমান সমবায় খাতের প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিয়ে আলোকপাত করেন । বিশেষ করে সমবায় সমিতির উপর যে অধিকহারে আয়কর ধার্য করা হয়েছে তা হ্রাস করতে সমবায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ।
এছাড়াও সমবায় উন্নয়নে সরকারের খুব বেশী বরাদ্দ থাকে না, এ বিষয়েও সমবায়ীদেরকে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান । কাক্কো তার সদস্য সমবায় সমিতির বিধিবদ্ধ অডিট পাওয়াতে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তিনি ফোরাম ও এজিএম-এর স্বার্থকতা ও সাফল্য কামনা করেন । একইসাথে তিনি যে কোনও প্রয়োজনে কাক্কোর পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ।
ফোরামে মূল আলোচনার পাশাপাশি সমিতি কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়ন ও নির্ধারিত কিছু সূচকের ভিত্তিতে সদস্য সমবায় সমিতির মধ্য হতে ৩টি সমবায় সমিতিকে ১ম, ২য় ও ৩য় হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় । যথাক্রমে - ১) ধরেন্ডা খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ, ২) হাসনাবাদ খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ, ৩) মহাখালী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ ।
ফোরামের শেষ সেশনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত সম্মতিতে এবং ৬ষ্ঠ ওপেন ফোরাম ঘোষণাপত্র, এসডিজি, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আকু কর্তৃক গৃহীত ব্যাংকক ঘোষণাপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে “৭ম ওপেন ফোরাম ঘোষণাপত্র” নির্ধারণ করা হয় ।
ঘোষণাপত্রটি কাক্কো এবং এর সদস্য সমিতিসমূহের জন্য আবশ্যকীয় করণীয় বলে গৃহীত হয় । গৃহীত ঘোষণাপত্রের মূল আলোচ্য বিষয় নিম্নরূপ :
১. স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষেমাত্রা অর্জনে সকল সদস্য সমিতিতে পেশাদারিত্ব প্রবর্তন করা হবে ।
২. রেগুলেটরদের সাথে সম্পর্কন্নোয়নের মাধ্যমে সমবায় বান্ধব রেগুলেটরি সিস্টেম চলমান রাখা ।
৩. ব্যবস্থাপনা পরিষদে নূন্যতম ৩০% যুব ও নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধি করা ।
৪. সমবায় সমিতি/ক্রেডিট ইউনিয়নের আবশ্যিকভাবে পালনীয় মানদন্ডসমূহ অনুসরণ করা (PEARLS-GOLD, ACCESS-CULEG, Capital Adequacy, Fit & Proper) ।
৫. খ্রীষ্টিয় আদর্শ ও মূল্যবোধ ধারণ করা এবং সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ।
৬. কাক্কো লিঃ-এর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে বৃহত্তর গ্রীণ বিনিয়োগ সুযোগ সৃষ্টি করা । পরিবেশ বান্ধব উৎপাদনমুখী সমবায় উৎসাহিত করা ও প্রমোশন করা ।
৭. সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নই সমবায়ের অন্যতম লক্ষ্য । এ লক্ষ্যে কাক্কো’র মাধ্যমে কার্যকরী সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করা ।
৮. ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে বর্তমান গতানুগতিক (Traditional) ধারা হতে উত্তরণ হয়ে ক্রমান্নয়ে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে প্রবেশ করা ।
৯. সমবায় সমিতিসমূহের আর্থিক ঝুঁকি হ্রাসকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা ।
১০. বাজারমূল্যে সমবায় সমিতির শেয়ার ভ্যালু নির্ধারণ এবং সুদের হার নির্ণয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা ।
১১. কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহকে কার্যকরীভাবে মোকাবেলা করা ।
১২. সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যুব ও নারীদেরকে সমবায়ের সাথে আবশ্যিকভাবে সম্পৃক্তকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করা ।
এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনসমূহের সফল বাস্তবায়ন কাক্কো’র নেতৃত্ব উন্নয়ন, সুশাসন এবং উদ্ভাবনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন । রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কাক্কো বাংলাদেশে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল সমবায় খাত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে । - শরৎ আলফন্স রড্রিক্স