আর্ন্তজাতিক নার্স দিবসে বাংলাদেশি ক্যাথলিক এক নার্সের আত্ননিবেদন ও দৃঢ়তার গল্প

গত ১২ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,সমগ্র বিশ্বে পালিত হলো আর্ন্তজাতিক নার্স দিবস। এ বছরের মুলভাব ছিলো “আমাদের নার্স আমাদের ভবিষ্যৎ, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স জীবন বাচাঁয়।” স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অসুস্থ্য ব্যক্তিদের মাঝে নিরলসভাবে তারা কাজ  করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে , যেখানে নার্সদের সংখ্যা এখনো তুলনামুলকভাবে কম সেখানে তারা প্রতিনিয়তই তাদের দায়িত্বে , বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে তবুও তারা সর্বাত্নকভাবে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের মধ্যে একজন হলেন এলিজাবেথ কোড়াইয়া ৪০ বছর বয়সী একজন ক্যাথলিক নার্স ।যিনি ঢাকার,“ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি” – এ কর্মরত আছেন। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের একজন  সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে তিনি সুদীর্ঘ অনেক সময় ধরে এই নার্স পেশায় নিয়োজিত আছেন। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠা রোগীদের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি যে সকল রোগীরা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পরিবারে ফিরে যায় তাদের মানসিক সাহস দানে ও তিনি সহায়তা দান করেন।

তিনি বলেন“নার্সিংয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়। বাংলা চলচ্চিত্রে সহানুভূতিশীল সেবাদানকারী নার্সদের উপস্থাপনাই তাকে এই পেশার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছিল।”

 তার এই স্বপ্নকে উৎসাহ দেন তার  পিশি সিস্টার গাইতেনিনা কোড়াইয়া যিনি একজন ব্রতধারিনী সমাজসেবি। তিনিই তাকে নার্সিং বিষয়ে পড়াশুনা করার জন্য মানসিকভাবে সমর্থন দান করেছেন। এলিজাবেথের কাছে নার্সিং শুধু একটি চাকরি নয়, বরং এটি এমন এক সেবার মাধ্যম যা সামাজিক ও ধর্মীয় ভেদাভেদ অতিক্রম করে।

তিনি বলেন, “এই পেশার মাধ্যমে সকল, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সেবা করা যায়। আমি সবসময় মানুষের সেবা করতে চেয়েছি, আর এখন আমি সেই কাঙ্ক্ষিত কাজই করছি।” এই পেশার কারণে আমার পরিবারের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আমি আত্মীয়স্বজনদেরও আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারি। একই সঙ্গে সমাজের মানুষ একজন নার্স হিসেবে আমাকে সম্মান করে।”তবে এই পেশার সঙ্গে সবসময়ই নানা চাপ ও চ্যালেঞ্জ জড়িয়ে থাকে। মহামারি ও জনস্বাস্থ্য সংকটের সময় নার্সদের যে ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়, সে বিষয়টিও তুলে ধরেন এলিজাবেথ।

তিনি বলেন, “যখন কোনো মহামারি দেখা দেয়, তখন নার্স ও চিকিৎসকরাই সবার আগে সাড়া দেন। আমাদের সবসময় সেবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এতে আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্যেরও ঝুঁকি থাকে, তবুও আমরা সাহসের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাই।”

তিনি বলেন, “একজন খ্রিস্টান নার্স হিসেবে আমি শান্ত ও ধৈর্যের সঙ্গে রোগীদের সেবা করার চেষ্টা করি। আমি সরাসরি যিশু সম্পর্কে প্রচার করি না, তবে আমার আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বাসকে প্রকাশ করার চেষ্টা করি।” “যখন আমি কোনো রোগীকে খুব সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখি, তখন নীরবে যিশুর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি ওই ব্যক্তিকে সুস্থ করেন এবং তার কষ্ট লাঘব করেন।”

আন্তর্জাতিক নার্স দিবসে এলিজাবেথ মানুষকে সরকারি হাসপাতালের প্রতি আরও আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তুলনামূলক কম খরচে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অভিজ্ঞ সেবা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন অনেক রোগী আসে। এর ফলে সেখানে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মানুষ কম খরচে ভালো চিকিৎসা নিতে পারেন।”

বাংলাদেশে প্রতি ১,০০০ মানুষের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা প্রায় ০.৬৬ জন, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার। অনেক সরকারি হাসপাতালে একজন নার্সকে এক শিফটে ১৫ থেকে ৩০ জন রোগীর সেবা দিতে হয়। এত কাজের চাপ ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশের নার্সরা ভিড়পূর্ণ ওয়ার্ড এবং প্রতিকূল পরিবেশেও নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এলিজাবেথের গল্প আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। নার্সরা শুধু চিকিৎসায় সহায়তা করেন না; অতিরিক্ত চাপের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তারা অনেক সময় অসুস্থতা, মানবিক মর্যাদা ও আশার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সেতুবন্ধন হয়ে ওঠেন।– আরভিএ সংবাদ ।