আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের জীবনীর উপর বর্ণময় নৃত্যনাট্য প্রদর্শন
বিগত ২৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, হিংসা, যুদ্ধ ও বিভেদের এই অস্থির সময়ে প্রকৃতি, মানুষ ও ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য বার্তা নিয়ে কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রাল অডিটোরিয়ামে মঞ্চস্থ হলো আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের জীবন অবলম্বনে এক বর্ণময় নৃত্যনাট্য।
যীশু সংঘ সমাজ পরিচালিত ‘কলাহৃদয়’ এবং কনস্যুলেট জেনারেল অফ ইতালি-র উদ্যোগে আয়োজিত এই নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের আধ্যাত্মিক জীবন, ঈশ্বরের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম সেবার আদর্শ।
অনুষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কলাহৃদয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফাদার ড. সাজু জর্জ এস.জে.। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণনগর ধর্মপ্রদেশের ধর্মপাল বিশপ নির্মল ভিনসেন্ট গোমেস, ভিকার জেনারেল ফাদার প্রদীপ মন্ডল সিএসএসআর, ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসিনী, শিল্পী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
“তোমারই জয়গান হোক”—এই মূল ভাবনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত নৃত্যনাট্যে সাধু ফ্রান্সিসের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ঐশ্বর্য ও আভিজাত্যে ভরা জীবন পরিত্যাগ করে কীভাবে তিনি সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের পথে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন, প্রকৃতি ও সৃষ্টির সৌন্দর্যের মধ্যে কীভাবে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন—তারই জীবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে মঞ্চে।
নৃত্যনাট্যে আরও তুলে ধরা হয়, তৎকালীন পোপের অনুমোদন ও সহযোগিতায় সাধু ফ্রান্সিস কীভাবে তাঁর আদর্শকে কেন্দ্র করে একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর জীবন ও প্রচারের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ কীভাবে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে এসেছিল এবং খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসের আলো কীভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই ইতিহাসও শিল্পের ভাষায় দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনায় কৃষ্ণনগর ধর্ম প্রদেশের ধর্মপাল বিশপ নির্মল ভিনসেন্ট গোমেস উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান। এরপর কলাহৃদয়ের সংগীত শিক্ষক ফাদার ড. শ্যামল মাখাল এস.জে.-এর কণ্ঠে প্রার্থনাসংগীত পরিবেশিত হলে অডিটোরিয়ামজুড়ে সৃষ্টি হয় এক গভীর আধ্যাত্মিক ও মনোমুগ্ধকর আবহ।
এরপর শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত নৃত্যনাট্য। নৃত্য, সংগীত, অভিনয় ও মঞ্চসজ্জার সমন্বয়ে সাধু ফ্রান্সিসের জীবন যেন মুহূর্তের জন্য জীবন্ত হয়ে ওঠে মঞ্চে। তাঁর আত্মত্যাগ, সরলতা, সৃষ্টির প্রতি মমতা এবং মানুষের সেবার আদর্শ দর্শকদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
নৃত্যনাট্য শেষে বিশপ নির্মল ভিনসেন্ট গোমেস ফাদার ড. সাজু জর্জ এস.জে. এবং নৃত্যনাট্যের সঙ্গে যুক্ত সকল শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এত সুন্দর ও সৃজনশীল উপায়ে সাধু ফ্রান্সিসের জীবন ও তাঁর আধ্যাত্মিক আদর্শ তুলে ধরার জন্য তিনি তাঁদের বিশেষভাবে অভিনন্দন জানান।
আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, হিংসা, সংঘাত ও বিভাজন মানবতার অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তখন সাধু ফ্রান্সিসের জীবন আমাদের সামনে নিয়ে আসে এক ভিন্ন পথ—ভালোবাসার পথ, শান্তির পথ, সেবার পথ। প্রকৃতিকে ভালোবাসা, সৃষ্টির প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের মুখ খুঁজে নেওয়ার যে শিক্ষা সাধু ফ্রান্সিস তাঁর জীবনের মাধ্যমে দিয়েছেন, কৃষ্ণনগরের এই নৃত্যনাট্য সেই বার্তাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল।
সত্যিই, ভালোবাসার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়—আর সাধু ফ্রান্সিসের জীবন সেই সত্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
প্রতিবেদন - তন্ময় মন্ডল
