ঢাকা ক্রেডিটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস

নারীদের অংশগ্রহণে উদযাপিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস

গত ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিসটাব্দ, দি খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের আয়োজনে ফার্মগেট তেজগাঁও চার্চ কমিউনিটি সেন্টারে হাজারো নারীদের অংশগ্রহণে উদযাপিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

সমিতির প্রেসিডেন্ট মাইকেল জন গমেজের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি মঞ্জু মারীয়া পালমা’র সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ৬টায় এই নারী দিবস পালন করা হয়। এই দিন তিন জন বিশেষ ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

এই বছর নারী দিবসের মূলসুর হলো “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায় বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”।

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হলিক্রস কলেজের প্রিন্সিপাল সিস্টার শিখা গমেজ সিএসসি এবং অতিথি বক্তা হিসেবে ছিলেন ফুড ফর হাংরি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর বুলি হাগিদক।

এদিনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি ও বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও, সাবেক প্রেসিডেন্ট ইগ্নাসিওস হেমন্ত কোড়াইয়া, দি সেন্ট্রাল এসোসিয়েশন অব খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভস্ (কাককো) লি:’র চেয়ারম্যান টুটুল পিটার রড্রিক্স, দি মেট্রোপলিটান খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান আগষ্টিন প্রতাপ গমেজ, তেজগাঁও হলি রোজারি চার্চের পাল-পুরোহিত জয়ন্ত এস. গমেজ।

ঢাকা ক্রেডিটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস

এছাড়াও আরো  উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ওয়াইএমসিএস অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও এশিয়া প্যাসিফিক এ্যালায়েন্স অব ওয়াইএমসিএএস’র জেন্ডার ইকুইটি কমিটির চেয়ারপার্সন মার্সিয়া মিলি গমেজ, ঢাকা ক্রেডিটের নারী বিষয়ক উপ-কমিটির আহ্বায়ক মনিকা গমেজ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট শিপন রোজারিও, ট্রেজারার সুমন জেমস্ ডি’কস্তা প্রমুখ, সাবেক ভাই-প্রেসিডেন্ট পাপড়ী দেবী আরেংসহ আরো অনেকে।

এ ছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন ক্রেডিটের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যবৃন্দ, উর্ধ্বতন কর্মী, নারী কর্মীসহ হাজারো নারীদের অংশগ্রহণে নারী দিবসটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ দিন সমিতির প্রেসিডেন্ট মাইকেল জন গমেজ বলেন, “প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী নানা আয়োজনে নারী দিবস পালন করে থাকে। ৮ মার্চ হলেও আজ ৭ মার্চ সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে সকল নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আমরা নারী দিবস উদযাপন করছি। আজ আপনাদের সাজ দেখেই বোঝা যায় দিবসটি আপনাদের কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দের।”

নারীদের ক্ষমতায়ন এবং বৈষম্য রোধ করতে এই নারী দিবস এসেছে। নারীদের কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন, পদমর্যাদা, পারিশ্রমিক, কর্মঘন্টাসহ নারীদের অধিকার সুনিশ্চিত করতেই এই নারী দিবস শুরু হয়েছে,” বলেন গমেজ।

তিনি আরো বলেন, “২০১১ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শত বছর পূর্তি পালিত হয়েছে আর এই ২০২৬ সালে ১১৫তম নারী দিবস পালিত হচ্ছে। নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা ক্রেডিটের দিকে তাকালেই বোঝা যায় আজ নারীরা কতোটা অগ্রসর। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে উদ্যোগী নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা ক্রেডিটের নারী বিষয়ক উপকমিটি। ঢাকা ক্রেডিটের সকল কর্মযজ্ঞের সফল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নারী উপকমিটির অবদান দিপ্তীমান।”

সমিতির ২২ জনের ব্যবস্থাপনা কমিটির চারজন বেয়ারারের মধ্যে সেক্রেটারি, বোর্ড অব ডিরেক্টর একজন, ক্রেডিট কমিটির চেয়ারম্যান এবং সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মোট চারজন নারী নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকা ক্রেডিটের প্রেক্ষিতেই বলা যায়, ব্যবস্থাপনা কমিটির মূল চালিকা শক্তিতেই নারীদের অংশগ্রহণ কতোটা আগ্রগামী।

ঢাকা ক্রেডিটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস

এ ছাড়াও উপদেষ্টা পরিষদের পাশাপাশি রয়েছে মোট ৭০টি সক্রিয় উপকমিটি। গতিশীল এসব উপকমিটির মধ্যে নারী বিষয়ক উপকমিটি অন্যতম সক্রিয় একটি কমিটি। সমিতির সকল উপকমিটির সাথে একাত্ম হয়ে নারী উপকমিটিও নানা প্রডাক্ট, ব্যবসায়িক ও সামাজসেবাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর গুণগতমান নিশ্চয়তার লক্ষে কার্যকর অবদান রেখে চলেছে।

প্রধান বক্তা সিস্টার শিখা বলেন, “নারী দিবসের লম্বা ইতিহাস রয়েছে। আমাদের নারী দিবসের তাৎপর্য হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। নারী হলো সৃষ্টিকর্তা সেরা সৃষ্টি। নারী আত্মবিশ্বাসী, জীবন যুদ্ধে লড়াকু, পাহাড়সহ স্থীর, নারী ভালবাসার আধার, নারী পরিনাম-পরিনীতা, নারী বহুরুপী, নারী ছায়াসঙ্গী। প্রতিটি মানুষ নারীদের মর্যাদা দিতে হবে। নারী শক্তিমান। সমাজ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক সব স্থানেই নারীর পদাচরণা রয়েছে।”

নারীকে একটু সুযোগ দিন, একটু ভালবাসা দিন, মর্যাদা দিন বদলে নারী দিবে এক সমুদ্র ভালবাসা। নারীরা যা করে শক্তি-সামার্থ নিয়েই করে। তাকে মর্যাদা দিতে হবে, স্বীকৃতি দিতে হবে, সর্বপরি আত্মমর্যাদা দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন দরকার। আমি ঢাকা ক্রেডিটকে ধন্যবাদ জানাই, তারা নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্র, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীদের স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক মুক্তি বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে,” বলেন সিস্টার শিখা।

তিনি আরো বলেন, “আমাদের সমাজে নারীদের অধিকার দিতে হবে। সকল ক্ষেত্রে নারী অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের নিজেদেরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। বলতে হবে, আমি পারি, আমি পারবো এবং আমিই পারবো।”

নারী বিষয়ক উপ-কমিটির আহ্বায়ক মনিকা গমেজ বলেন, “আন্তর্জাতিক নারী দিবস মূলত নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ফসল। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কে পোশাক শ্রমিকদের প্রতিবাদ এবং ১৯০৮ সালের আন্দোলনের পর, ১৯১০ সালে ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত।”

১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে,” বলেন গমেজ।

বিশেষ বক্তা বুলি হাগিদক বলেন, “আমি আজ বক্তব্য দিতে আসিনি, আমি উৎসাহ দিতে এসেছি। আমরা অনেক নারী জানি না, আমাদের মধ্যে কোন অগ্নিশিখা রয়েছে। আজ সময় হয়েছে আমাদের নারীদের জেগে ওঠার। এখন নারীরা নয়, বলতে হবে আমিই পারি। তাহলে কোনো বাধাঁও থাকবে না, কেউ রুখেও দিতে পারবে না। আমার নিজের ইচ্ছেতেই সবকিছু শুরু করতে হবে।”

আর্থিক স্বচ্ছলতা ছাড়া কোনোকিছুই করা যায় না। তাই আপনাদের উৎসাহ দিতে চাই, যারা আমরা চাকরি করি বা কাজ করি, সেখানেই যেন থেমে না থাকি। আমরা যেন আরো ভালোকিছু করতে পারি সেইভাবেই আগাতে হবে। আজকের এই বিশেষ দিনে আমাদের ইচ্ছে শক্তি ধারণ করতে হবে,” বলেন হাগিদক।

এ দিন অন্যান্য বক্তাগণ বলেন, “আজ এই নারী দিবসে বিশ্বের সকল নারীদের শুভেচ্ছা জানাই। অনেক ক্ষেত্রেই এখন পুরুষের চেয়েও নারীরা বেশি সক্রিয়। নারীদের সমাজে অনেককিছুই দেয়ার রয়েছে।”

ঢাকা ক্রেডিটকে ধন্যবাদ জানাই যে নারীদের উন্নয়ন এবং সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া সেলের নির্মিত ডকুমেন্টরী দেখেই বোঝা যায় ঢাকা ক্রেডিটের নারীদের অংশগ্রহণ, নারী বিষয়ক উপ-কমিটির ভূমিকা, কর্মক্ষেত্র এবং নারী নেতৃত্বে প্রভাব কতোটা উজ্জ্বল।

২০০৮ সালে নারী বিষয়ক উপ-কমিটি যাত্রা শুরু করে। এই ১৮ বছরে নারী কমিটি অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ঢাকা ক্রেডিটকে ধন্যবাদ নারীদের এগিয়ে নিতে অবদান রাখার জন্য।

তারা বলেন, “নারীদের আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমতা অর্জনে এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের সামনের সারিতে নিয়ে আসতে হলে আমাদের সচেতনভাবে নারী অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।”

৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার সহকারী বিশপ সুব্রত বি. গমেজের স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, পুণ্যপিতা পোপ চতুর্দশ লিও ফাদার গাব্রিয়েল কোড়াইয়াকে মন্সিনিয়র, মিস ডোরা ডি’রোজারিও ক্রস প্রো একলেসিয়া ইটি পন্টিফিস (Croce Pro Ecclesia et Pontifice) এবং মিসেস রেবেকা কুইয়াকে বেনেমেরেন্টি পদকে ভূষিত করেছেন। ঢাকা ক্রেডিট স্বীকৃতিস্বরূপ এদিন নন্দিত এই তিনজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে।

এ ছাড়াও এ দিন ঢাকা ক্রেডিটের নারী কর্মকর্তা সেক্রেটারি মঞ্জু মারীয়া পালমা, ডিরেক্টর মনিকা গমেজ, ক্রেডিট কমিটির চেয়ারম্যান উমা ম্যাগডেলিন গমেজ, সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান মারীয় ডি’কুনাকে ঢাকা ক্রেডিটের পক্ষ থেকে বিশেষ শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র বাইবেল পাঠ করেন ঢাকা ক্রেডিটের প্রাক্তন ডিরেক্টর পাপিয়া রিবেরু এবং প্রার্থনা করেন সাবেক ভাইস-প্রেসিন্টে পাপড়ী দেবী আরেং। শেষ প্রার্থনা করেন ক্রেডিট কমিটির চেয়ারম্যান উমা ম্যাগডেলিন গমেজ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সহযোগিতা করেন ঢাকা ক্রেডিটের কর্মী চম্পা মনিকা গমেজ এবং স্মৃতি ক্রুজ।

অনুষ্ঠানে নারী কমিটির কার্যক্রম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন; মোবাতি প্রজ্জ্বলন; নারী বিষয়ক উপ-কমিটি ও কালচারাল একাডেমির উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথিবৃন্দের উপহার প্রদান অনুষ্ঠিত হয়।

সমিতির ভাইস-প্রেসিডেন্ট শিপন রোজারিও সমাপনী বক্তব্য প্রদান করে অনুষ্ঠানের সমাপ্ত ঘোষণা করেন। - ডিসিনিউজবিডি