“ঐশ অনুগ্রহে আর্শীবাদিত, সেবায় নিবেদিত” ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের হীরক জয়ন্তী পালনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
গত ২১ এপ্রলি ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের রমনা সেন্ট মেরীস্ ক্যাথিড্রাল ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের হীরক জয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
উক্ত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও, আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ, বিশপ থিওটোনিয়াস গমেজ,এবং বিশপ সুব্রত বনিফাস গমেজ।
এই হীরক জয়ন্তী উৎসবের মূলসুর হলো “ঐশ অনুগ্রহে আর্শীবাদিত, সেবায় নিবেদিত”। এতে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের বিভিন্ন ধর্মপল্লী থেকে আগত ফাদার, ব্রাদার, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সিস্টার, সেমিনারীয়ান এবং খ্রিস্টভক্তগণ উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের হীরক জয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই সহকারী বিশপ সুব্রত বনিফাস গমেজ সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “আমরা প্রথমেই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই তাঁর আশীর্বাদ ও কৃপাদানের জন্য কারণ তিনি ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশকে অনেক দানে পুণ্য করেছেন তাই আজ আমরা এই হীরক জয়ন্তী উৎসব উদযাপন করতে পারছি।”
তিনি আরো বলেন, “এই আর্চবিশপ হাউজের এই আঙ্গিনা অনেক পবিত্র অনেক পবিত্র মানুষের পদচারণা এই আঙ্গিনাতে রয়েছে। ঈশ্বরের সেবক এবং দুইজন আর্চবিশপ ও এইখানে সমাহিত আছেন। দেখতে দেখতে আমাদের এই ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ আজ ৭৫ বছরে এসে উপনিত হয়েছে। আর তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা হীরক জয়ন্তী উৎসব পালন করতে যাচ্ছি।”
“ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের হীরক জয়ন্তীর এই শুভ লগ্নে ঈশ্বর যেন আমাদের প্রত্যেককের উপর বিশেষ আশীর্বাদ বষর্ণ করেন যেন আমরা এই মহাধর্মপ্রদেশে সকলে মিলে একটা মিলন সমাজ গড়ে তুলতে পারি”, বলেন বিশপ গমেজ।
এই অনুষ্ঠানে পবিত্র খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ। তিনি তাঁর উপদেশ বাণীতে বলেন, “যিশুর পুনরুত্থান আমাদের বিশ্বাসের জীবনে একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা। এই বিশ্বাস আমাদের জীবনকে নতুন জীবন দেয় অর্থাৎ রুপান্তরিত করে। যিশু পুনরুত্থান করেছেন বলেই আমরা একটি পরিবারে রুপান্তরিত হতে পেরেছি।”
তিনি পোপ ষোড়শ বেনেডেক্টের উক্তি তুলে ধরে বলেন, “প্রভুর পুনরুত্থান একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা যা মানব যিশু প্রকাশ করেছেন তার গমন দ্বারা। এটি অনন্য এমন একটি ঘটনা যা আর কোনদিন পুনরাবৃত্তি হবে না।”
এই অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল স্বাগত বক্তব্য, লগো উন্মোচন ও উদ্বোধনী ঘোষণা, লগোর ব্যাখ্যা, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, উদ্বোধনী নৃত্য, বেলুন উড্ডীয়ন, পুনরুত্থান প্রদীপসহ শোভাযাত্রা এবং পবিত্র খ্রিস্টযাগ।
ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বঙ্গে তথা বংলাদেশে খ্রিস্টানদের উপস্থিতি পাঁচশত বছরের অধিক সময় থেকে। বঙ্গে পর্তুগীজদের আগমনের (১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) সাথে সাথে তা স্পষ্ট হয়। কেননা মনে করা হয়, খ্রিস্টবিশ্বাসী পর্তুগীজগণই খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তন করেন এ বাংলায়।
১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজের মাইলাপুর; ধর্মপ্রদেশের স্বীকৃতি পেলে ঢাকাসহ সমগ্র বঙ্গের খ্রিস্টবিশ্বাসীরা এ ধর্মপ্রদেশের আওতাভুক্ত হন।
১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে ১৮ এপ্রিল সমগ্র বঙ্গকে মাইলাপুরের অধীনে রেখেই পাদ্রিয়ানো চুক্তির বাইরে গিয়ে পোপীয় বিশ্বাস বিস্তার সংস্থার অধীনে ভিকারিয়েট অ্যাপস্টলিকের মর্যাদায় উন্নীত করলে ঢাকা বঙ্গীয় ভিকারিয়েটের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গীয় ভিকারিয়েট পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গে বিভক্ত করে পোপ ৯ম পিউস পূর্ববঙ্গের অ্যাপস্টলিক ভিকারিয়েটের দায়িত্ব অর্পণ করেন বিশপ টমাস অলিভকে।
১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বঙ্গীয় ভিকারিয়েট আনুষ্ঠানিকভাবে কোলকাতা ভিকারিয়েট থেকে পৃথক হয়ে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ঐ সময় পূর্ব বঙ্গীয় ভিকারিয়েটের আওতাধীন ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, আসাম ও আরাকান অঞ্চল।
জানা যায় যে, ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টার সমন্বিত মিশনারী প্রথম দল ঢাকায় আসেন এবং পরে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ১ সেপ্টেম্বর পোপ ত্রয়োদশ লিও পোপীয় প্রৈরিতিক অনুশাসনপত্র দ্বারা ঢাকাকে ধর্মপ্রদেশ ঘোষণা করেন।
সে ঘোষণায় বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশ এলাকা, আসামের শিলাচর ও বার্মার প্রোম এলাকা ঢাকার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে পোপ ত্রয়োদশ লিও ফরাসী যাজক ফাদার আগষ্টিন লুয়াজ, সিএসসিকে ঢাকা ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ মনোনীত করেন।
তিনি ১১ জানুয়ারি, ১৮৯১ অভিষিক্ত হয়ে একই সনের ১০ মার্চ লক্ষ্মীবাজারে এসে বিশপীয় দায়িত্ব নেন। ঐ সময় থেকে লক্ষ্মীবাজার পরিচিত হয় ‘হলিক্রস ক্যাথিড্রাল’ হিসেবে।
পরে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রমনায় অবস্থিত বর্তমান আর্চবিশপ ভবনটি বিশপ আরমা ল্যাঁগ্রার পরিকল্পনা ও ভিকার জেনারেল ফাদার তিমথি ক্রাউলীর অত্যন্ত পরিশ্রম ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়।
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে পোপ ১১শ পিউস ঢাকাকে বিভক্ত করে ‘চট্টগ্রাম’ধর্মপ্রদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রামের প্রথম বিশপ নিযুক্ত হন বিশপ আলফ্রেড ল্য পাইয়োর, সিএসসি।
উল্লেখ্য যে, ১৫ জুলাই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে পুণ্যপিতা দ্বাদশ পিউস ঢাকা ধর্মপ্রদেশকে কোলকাতা মহাধর্মপ্রদেশ থেকে পৃথক করে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশে উন্নীত করেন এবং বিশপ লরেন্স লিও গ্রেণার, সিএসসিকে ঢাকার প্রথম আর্চবিশপ মনোনীত করেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই আর্চবিশপ লরেন্স গ্রেণার, সিএসসির জারিকৃত এক নির্দেশনাবলে কাকরাইলের গির্জাটিকে ‘ধন্যা কুমারী মারীয়ার অমলোদ্ভবার ক্যাথিড্রাল’- এ উন্নীত করা হয়।
পরে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে আর্চবিশপ থিওটোনিয়াস অমল গাঙ্গুলী সিএসসি কাকরাইলের ক্যাথিড্রালের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করেন ‘সেন্ট মেরীস ক্যাথিড্রাল’।
উল্লেখ্য প্রথম বাঙালি বিশপ থিওটোনিয়াস অমল গাঙ্গুলী, সিএসসি ৭ অক্টোবর, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কাকরাইল, রমনার এই ক্যাথিড্রালেই বিশপরূপে অভিষিক্ত হন এবং ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মে পোপ ২য় জন পল ঢাকাকে বিভক্ত করে ময়মনসিংহকে নতুন ধর্মপ্রদেশ বলে ঘোষণা দেন এবং ফাদার ফ্রান্সিস আন্তুনী গমেজকে প্রথম বিশপ হিসেবে মনোনীত করেন। ২০০০ খ্রিস্ট জয়ন্তী পালন-উত্তর ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের নতুন পালকীয় ক্ষেত্র গাজীপুর-মানিকগঞ্জ-সাভার (গামাসা) বিশেষ মনোযোগে আসে।
৮ জুলাই ২০১১ খ্রিস্টাব্দে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট সিলেটকে ঢাকা থেকে পৃথক করে নতুন ধর্মপ্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ, ওএমআইকে সিলেটের প্রথম বিশপ হিসেবে মনোনীত করেন।
তবে চারটি ধর্মাঞ্চল (ঢাকা শহার, ভাওয়াল, আঠারোগ্রাম ও গামাসা) নিয়ে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ গঠিত। - আরভিএ সংবাদ