কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি: “২০৩৩–কে সামনে রেখে আগামী আট বছর হবে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের সময়”

আশার মহা তীর্থযাত্রা যখন হাজারো খ্রীষ্টভক্তকে পেনাংয়ে সমবেত করে, তখন ফেডারেশন অফ এশিয়ান বিশপ কনফারেন্সের (FABC) সভাপতি কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি এই অভিজ্ঞতাকে এশিয়ার উপর এর তাৎপর্য এবং মহাদেশ জুড়ে মন্ডলীর ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তাঁর প্রতিফলন সকলের সাথে সহভাগিতা করেন।

পেনাং ডায়োসিসের সামাজিক যোগাযোগ দফতরের প্রধান ড্যানিয়েল রয়ের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা একত্রিত হন, যেখানে তারা ২০৩৩ সালের জুবিলি বর্ষের যাত্রাপথ— খ্রীষ্টের মৃত্যু ও পুনরুত্থানের ২,০০০ বছর পূর্তি—নিয়ে খ্রীষ্টমন্ডলীর ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন ।

মহাযাত্রাকে এক কথায় বর্ণনা: “একসাথে পথচলা”

আশার মহাতীর্থযাত্রাকে একটি শব্দে বর্ণনা করতে বলা হলে, কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি উত্তর দেন: “যীশুর বিনম্র সাক্ষী হিসেবে একসাথে পথচলা।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে FABC–এর সভাপতি হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য মহাদেশীয় সমাবেশে অংশগ্রহণই তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, “মহাদেশীয় সম্মেলনের জন্য আমি লাতিন আমেরিকা সফরের সুযোগ পেয়েছিলাম এবং একইভাবে আফ্রিকায় SECAM–এর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনেও অংশ নিয়েছি। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে আমাদের এশীয় মহাদেশের স্বতন্ত্রতা গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, এশিয়া, বৈচিত্র্যে অনন্য—ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের ভিন্নতা মহাদেশ জুড়ে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। মন্ডলীর প্রতিবন্ধকতা গুলি হলো এশিয়ার জনগণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে, এমনকি যাদেরকে আমরা অন্য ধর্মে বিশ্বাসী বলে থাকি তাদের সঙ্গেও সম্মান ও নম্রতার সাথে একসঙ্গে পথচলাকে বোঝায়।

তিনি বলেন “সিনডালিটি বলতে এটাই বোঝায়, “আমরা এশিয়ার সকল অন্যান্য তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে সহযাত্রী হয়ে পথ চলি।”

কার্ডিনাল জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের যাত্রা কেবল সভা-সমাবেশ বা ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর মূল করণীয় হলো নম্রতা, সংলাপ ও শ্রবণশীলতার এক আধ্যাত্মিক মনোভাব তৈরি করা, যা সুসমাচার এবং যীশুর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হবে। তিনি বলেন, “আমাদের শুধু ঘোষণা করার জন্যই নয়, বরং মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটার জন্য আহ্বান করা হয়েছে—আমাদের যৌথ যাত্রার মধ্য দিয়ে খ্রীষ্ট প্রেমের সাক্ষ্য বহন করতে হবে।”

প্রথম এশীয় মিশন কংগ্রেস: এত দেরি হলো কেন?

কার্ডিনাল ফিলিপ নেরিকে ২০০৬ সালের এশিয়ান মিশন কংগ্রেস সম্পর্কে এবং কেন এমন একটি সমাবেশ আবার হতে দুই দশক লেগে গেল—এ নিয়েও প্রশ্ন করা হয়, পাশাপাশি পরবর্তী কংগ্রেস কবে হতে পারে সে সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।

তিনি বলেন, “আমি বলব, কেন এতদিন এটি অনুষ্ঠিত হয়নি তা আমরা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারি না। এটির সভাপতি হিসেবে আমার প্রথম বছর, এবং আমার সহ-সভাপতিও একই সময় থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।”

তিনি উল্লেখ করেন যে ২০০৬ সালে চিয়াং মাই–এ অনুষ্ঠিত কংগ্রেসটি সম্ভব হয়েছিল FABC–এর এভাঞ্জেলাইজেশন অফিসের উদ্যোগ ও উদ্দীপনার ফলে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “FABC বিভিন্ন অফিসের মাধ্যমে কাজ করে, এবং তখন এভাঞ্জেলাইজেশন অফিসই এই উদ্যোগ নিয়েছিল।”

সেই কংগ্রেসের পর প্রকৃত কাজ ছিল এর পরবর্তী কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করা। কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি উল্লেখ করেন যে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ডায়োসিস এবং মিশন সম্মেলনগুলো এই গতিকে বজায় রাখতে কাজ চালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “উদাহরণ হিসেবে  বলা যায় যে এই প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখতে ভারতেই আমরা ডায়োসিস ও আঞ্চলিক মিশন কনফারেন্স করেছি, এবং জাতীয় মিশন কংগ্রেসও আয়োজন করেছি।”

তিনি বর্তমান আশার মহা তীর্থ যাত্রা (Pilgrimage of Hope) বাস্তবায়নে FABC Office-OE–এর চেয়ারম্যান বিশপ জর্জ পাল্লিপারামবিল এবং তাঁর দলের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে পরম শ্রদ্ধেয় পোপ ফ্রান্সিসকে, যিনি সিনডাল যাত্রার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানান। সেই যাত্রাই আমাদের ডায়োসিস, জাতীয় এবং মহাদেশীয় স্তরে একত্র করেছে। এ বছর যেহেতু আশার জুবিলি বর্ষ, এবং সামনে ২০৩৩–কে মাথায়  রেখে, অনুষ্ঠানটি যথাযথ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।”

ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি: পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হলো মূল চাবিকাঠি

এমন বিশাল আয়োজনের গুরুত্ব স্বীকার করে কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি সতর্ক করেন যে, এই ধরনের মহাদেশীয় সমাবেশ ঘন ঘন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন। এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে, ডায়োসিস, বিশপ সম্মেলন এবং ফিলিপাইন ও ভারতের মতো বড় দেশের মধ্যে পরবর্তী কার্যকলাপগুলি সংগঠিত করা।”

কার্ডিনাল জোর দিয়ে বলেন, আশার তীর্থযাত্রা(Pilgrimage of Hope)–এর কার্যকারিতা ও ফলপ্রসূতা কেবল অনুষ্ঠানটির ওপর নির্ভর করবে না; এটি নির্ভর করবে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ এবং এখান থেকে যে শিক্ষা লাভ করা হলো তা  বাস্তবায়ন করার ওপর। তিনি বলেন, “আগামী আট বছর আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কার্যকর ফলো-আপে গুরুত্ব দেওয়া—এখানেই কংগ্রেসের প্রকৃত প্রভাব অনুভূত হবে।”

নম্র সাক্ষ্য

সমগ্র প্রতিফলনে কার্ডিনাল ফিলিপ নেরি বারবার একটি প্রসঙ্গে ফিরে আসেন: এশিয়ায় খ্রীষ্ট মন্ডলীর অংশগ্রহণকে অবশ্যই নম্রতা, সহচরিতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

তিনি বলেন “আমাদের আহ্বান হলো একসাথে পথচলা”। “যীশুর বিনম্র সাক্ষী হওয়া মানে হলো অন্যদের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটা, তাদের কাছ থেকে শেখা এবং এমনভাবে সুসমাচার ভাগ করা যা হৃদয় পরিবর্তন করে তবে জোর করে কোন কিছু চাপিয়ে দেয় না এটিই হলো আমাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য।”

যখন আশার তীর্থযাত্রা (Pilgrimage of Hope ) পেনাংয়ে চলমান তখন, কার্ডিনালদের কথাগুলো অংশগ্রহণকারীদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে এশিয়ায় খ্রীষ্টমন্ডলীর ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র বড় বড় আয়োজনের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে ধৈর্যশীল, নম্র এবং ধারাবাহিক বিশ্বাসের যাত্রার ওপর।

প্রতিবেদন- রেডিও ভেরিতাস এশিয়া

অনুলিখন- তেরেজা রোজারিও