সোমালিয়ার আয়ান হিরসি আলির : নাস্তিকতা থেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ

গত ২০ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিশ্বে  পালিত হলো বিশ্ব শরণার্থী দিবস। এই বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আলোচনায়  এসেছে সোমালিয়ার বংশোদ্ভূত  নাগরিক, আয়ান হিরসি আলি যিনি নাস্তিকতা থেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন।

 ১০৬৯ খ্রিস্টাব্দে ,সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণকারী আয়ান হিরসি আলি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারিবারিক অস্থিরতার কারণে শৈশবের বড় একটি অংশ বিভিন্ন দেশে কাটিয়েছেন। তিনি সৌদি আরব, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ায় বসবাস করেছেন, মুসলিম গরিষ্ট লোকের বসবাস রয়েছে।

অনেক পরিতাপের বিষয় হলো এই যে ,মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর দাদীর উদ্যোগে তাঁর ওপর নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃতি প্রথা প্রয়োগ করা হয়। পরবর্তী জীবনে তিনি এই অভিজ্ঞতাকে তাঁর শৈশবের অন্যতম বেদনাতুর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেক শরণার্থীর মতো তাঁর শৈশবও অনিশ্চয়তা এবং কোথায় নিজের একটি নিরাপদ ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাবে এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেটেছে।

তার শৈশবের কষ্ট কাটতে না কাটতেই তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে তার উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই বিয়ে এড়াতে তিনি নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে যান এবং আত্নরক্ষা করেন।

নেদারল্যান্ডসে রাজনৈতিক আশ্রয় (asylum) লাভের পর তিনি শিক্ষা ও জনসেবার মাধ্যমে নিজের জীবন নতুনভাবে গড়ে তোলেন এবং পরবর্তীকালে ডাচ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নারীর অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অভিবাসীদের সমাজে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তাঁর লেখালেখি ও জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

 ২০০৫ সালে Time সাময়িকী তাঁকে বিশ্বের ১০০ জন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন হিসেবে নির্বাচিত করে, যা তাঁকে একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী (public intellectual) হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে Ayaan Hirsi Ali ইসলাম ধর্মের অন্যতম সুপরিচিত সমালোচক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, বিশেষ করে নারীদের জন্য ক্ষতিকর বলে তিনি যে ধর্মীয় কিছু প্রথা ও বিশ্বাসকে মনে করতেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে তিনি সরব হন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পর তিনি ধর্মীয় উগ্রবাদের সমালোচনায় আরও স্পষ্টভাষী হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে নিজেকে একজন নাস্তিক (atheist) হিসেবে পরিচয় দেন।কিন্তু ২০২৩ সালে তিনি তাঁর সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষকেই বিস্মিত করে ঘোষণা দেন যে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন।

নিজের এই দীর্ঘ যাত্রার কথা স্মরণ করতে গিয়ে হিরসি আলি বলেন, তিনি একসময় ব্রিটিশ দার্শনিক Bertrand Russell-এর লেখার সঙ্গে পরিচিত হন। রাসেল ছিলেন বিংশ শতাব্দীর খ্রিস্টধর্মের অন্যতম প্রভাবশালী সমালোচক।

হিরসি আলির মতে, খ্রিস্টধর্ম তাঁকে এমন একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি প্রদান করেছে, যা তিনি ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে খুঁজে পাননি। তাঁর এই প্রবন্ধ বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী—উভয় মহলেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কেউ তাঁর সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসের স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতার একটি উদাহরণ হিসেবে স্বাগত জানান, আবার কেউ তাঁর যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা তাঁর ধর্মান্তরকে মূলত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করছে, তখন হিরসি আলির জীবনকাহিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শরণার্থীরা সীমান্ত অতিক্রম করার সময় শুধু তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রই বহন করেন না; তাঁরা সঙ্গে নিয়ে চলেন নিজেদের পরিচয়, স্বাধীনতা এবং কোথায় তাঁদের প্রকৃত আপন ঠিকানা—এসব গভীর প্রশ্নও।হিরসি আলির ক্ষেত্রে সেই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত রাজনীতি ও দর্শনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বাসের প্রশ্নেও পৌঁছায়।

মানুষ তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হোক বা না-হোক, আয়ান হিরসি আলির জীবন দেখিয়ে দেয় যে,একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান অনেক সময় জীবনের গভীর অর্থের সন্ধানেও পরিণত হতে পারে। - আরভিএ সংবাদ ।