ঢাকায় জাতীয় চার্চ পরিষদের ৭৫ বছর পূর্তি জুবিলী উদ্যাপন
গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউতে কাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব বাংলাদেশ (সিবিসিবি) মিলনায়তনে ঢাকায় জাতীয় চার্চ পরিষদের ৭৫ বছর পূর্তি জুবিলী উদ্যাপন করা হয়।
“রূপান্তরের মাইলফলকে ঈশ্বরের মহাগৌরবে আনন্দময় উদ্যাপন, যা এখনই কাজ করার অনুপ্রেরণা” প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় চার্চ পরিষদ বাংলাদেশের (এনসিসিবি) ৭৫ বছর পূর্তি (প্লাটিনাম জুবিলী) উদ্যাপিত হয়েছে।
এতে দেশি-বিদেশি অতিথি, বিভিন্ন ধর্মের নেতৃবৃন্দ এবং খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের মণ্ডলী, সহযোগী ও প্রতিবেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নেন।
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এনসিসিবির সাড়ে সাত দশকের পথচলা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, “বাংলাদেশ সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের দেশ।”
তিনি আরো বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রীষ্টান এবং চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতালসহ সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।”
আহমেদ আযম খান আরো বলেন, “ধর্ম যার যার, ধর্মীয় উৎসব যার যার, রাষ্ট্র আমাদের সবার।” সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।”
তিনি আরো বলেন, “গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর আঘাত আসে। তাই সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ জন্য দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নমুক্ত দেশ গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দি খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি:, ঢাকা’র প্রেসিডেন্ট মাইকেল জন গমেজ। তিনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং ৭৫ বছরের এই পথচলায় এসিসিসবি’কে শুভেচ্ছা জাজান।
প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার বলেন, “সরকার সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের সমস্যা জানার চেষ্টা করছে। এসব সমস্যা লিখিত ও মৌখিকভাবে সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন।”
বিজন কান্তি সরকার বলেন, “সরকারের বয়স এখনো বেশি হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী সব ধর্ম, বর্ণ ও জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন।”
তিনি আরো বলেন, “কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বিহারের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের কার্যক্রমে কোথাও ঘাটতি বা ব্যর্থতা থাকলে তা তুলে ধরার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান।”
অনুষ্ঠানে এনসিসিবির সভাপতি স্যামুয়েল সুনীল মানখিন বলেন, “৭৫ বছর আগে যাঁরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। তাঁদের প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় আজ ২১টি ডিনোমিনেশন ও ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে এই আয়োজন করতে পেরেছেন।”
তিনি আরো বলেন, “শান্তি, ন্যায্যতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কাজ করছে জাতীয় চার্চ পরিষদ।”
তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের সব ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এনসিসিবি।”
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও সকল মন্ডলীকে সেবার জন্য এক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ঐ সময়ে যখন সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এটার সত্যিকারেই দরকার ছিল।”
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, যুক্তরাষ্ট্রের ওমনিয়া ইনস্টিটিউট ফর কনটেক্সচুয়াল লিডারশিপের সভাপতি রেভারেন্ড ড. শান্তা প্রেমাবর্ধনা, প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের (যুক্তরাষ্ট্র) দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৈশ্বিক আন্তগির্জা যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তা রেভারেন্ড ক্যাথরিন সুজান চ্যাং এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জন গমেজ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিসিবির সাধারণ সম্পাদক ডেভিড অনিরুদ্ধ দাশ। তিনি সংগঠনটির দীর্ঘ পথচলা ও কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৭৫ বছরে এনসিসিবি’র বর্তমান সদস্যসংখ্যা ২১ এবং সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন চার্চ ও খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে ত্রাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংগঠনটি তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। - ডিসিনিউজ
