আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দিবস উদযাপনে বিশপ এলায়াস ফ্রাঙ্কের সাথে চায়ের আসর
বিগত ১৭ই মে, ২০২৬ সালের বিকেল ৪টায়, বিশ্ব যোগাযোগ দিবস (World Communications Day) উপলক্ষে কলকাতার আর্চবিশপ হাউসে আর্চডায়োসিসান সোশ্যাল কমিউনিকেশনস কমিশন (Archdiocesan Social Communications Commission - ASCC - এএসসিসি) ‘চায়ে পে চর্চা’ নামক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই চায়ের আসরে কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিভাগের বিভিন্ন অংশীদারগণ কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশের মহাধর্মপাল এলায়াস ফ্রাঙ্ক মহোদয়ের সাথে মুক্ত মনে তাঁদের মতামত বিনিময় করেন।
এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন:
‘দ্য হেরাল্ড’-এর প্রাক্তন সম্পাদক ফাদার জুলিয়ান দাস এস জে; ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র বিশিষ্ট সাংবাদিক কুমারী এ্যালথিয়া ফিলিপস; লেখিকা ও প্রাক্তন আঞ্চলিক যোগাযোগ সচিব শ্রীমতি মিনি যোসেফ; রেডিও ভেরিতাস এশিয়া বাংলা বিভাগের কুমারী তেরেসা রোজারিও; ডন বস্কো নিতিকা কলকাতার সেলেসিয়ান যাজকদ্বয় সরোজ মল্লিক ও নির্মল টপ্পো; কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশের চ্যান্সেলর ফাদার ডমিনিক গোমেস গোমেস; রাজেশ মুর্মু - ডন বস্কো লিলুয়ার মিডিয়া প্রতিনিধি,; ফাদার রবার্ট অ্যান্থনি এস জে - মিডিয়া প্রতিনিধি, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ; ‘দ্য হেরাল্ড’-এর প্রতিনিধি সিবিল ডেভিড; এএসসিসি-এর প্রতিনিধিগণ শ্রীমতি ধনলক্ষী কালীরাম ও শ্রীমতি ক্রিস্টিন ক্র্যামার এবং স্বাধীন সাংবাদিক, অনুবাদক ও অনুলিপিকার আইজ্যাক হ্যারল্ড গোমস্।
এএসসিসি -এর পরিচালক ফ্যারেল শাহ আর্চবিশপ এলায়াস ফ্রাঙ্ক মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনার সূচনা করেন।
বর্তমান সময়ে মন্ডলীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে উপস্থিত সকল অংশীদারগণের অকপট মতামত আহ্বান করার শুরুতেই আর্চবিশপ এলায়াস বলেন, “আমাদের বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর কোলাহল বা অতিরঞ্জন দেখা যায়। আসুন, আমরা সবাই আনন্দের সংবাদগুলোই বেশি করে পরিবেশন করি এবং নেতিবাচক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলি।”
আর্চবিশপের পর্যবেক্ষণের কয়েকটি বিষয় নীচে তুলে ধরা হলো:
১.কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দেখে আমাদের ভীত বা অভিভূত হওয়া উচিত নয়।
২.পোপ লিও-এর বিশ্ব যোগাযোগ দিবসের বার্তার সূত্র ধরে তিনি বলেন যে, মানুষের মুখচ্ছবি ও কণ্ঠস্বর অত্যন্ত পবিত্র কারণ তা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার আদলে তৈরি; তাই তিনি খ্রীষ্টান যোগাযোগ বা সামাজিক মাধ্যম বিশারদদের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা যেন কখনোই তাঁদের ‘সমালোচনামূলক বা সৃজনশীল স্বকীয়তা’ (Critical Thinking) বিসর্জন দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাস হয়ে না যান।
৩.তিনি আরও প্রশ্ন রাখেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কি আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা কেড়ে নিতে পারে?”
৪.তিনি বলেন যে, প্রতিটি ধর্মপল্লী অর্থ কমিটি (Parish Finance Committee - PFC)-র উচিত ধর্মপল্লীর বিভিন্ন কমিশনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা। অন্যথায় কমিশনগুলির সদস্য-সদস্যারা তাঁদের কাজগুলি দায়সারা ভাবে করবে।
৫. তিনি ক্যাটেকিস্টদের (ধর্মশিক্ষার শিক্ষকদের) নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন।
৬. তিনি মনে করেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের প্রয়োজন, পছন্দ-অপছন্দগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, তিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের এবং যাঁরা আর তরুণ নন, তাঁদেরও প্রতি মনোযোগে ঢিলেমি না দেওয়ার কথা বলেন।
৭.তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, অধিকাংশ ধর্মপল্লীতেই ক্যাথলিক পরিবারের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। হাওড়ার একটি বড় ধর্মপল্লীতে গত এক বছরে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, অথচ সেখানে মাত্র দু’জনের দীক্ষাস্নান হয়েছে। জন্মের তুলনায় মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক ভাবে অনেক বেশি।
৮.তিনি আরও বলেন একজন যাজক, বিশেষ করে পাল-পুরোহিতের, ব্যবহারিক অঙ্গভঙ্গি বা ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ ধর্মপল্লীবাসীদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৯.হালকা মেজাজে তিনি যোগ করেন যে, কৌতুক বা রসিকতাও পারস্পরিক ভাবের আদানপ্রদানের একটি চমৎকার মাধ্যম হতে পারে।
• সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ফাদার রবার্ট অ্যান্থনি সামাজিক মাধ্যমে রোজকার ‘ভাইরাল’ হওয়া খবরাখবর সম্পর্কে যোগাযোগমাধ্যম বিশারদদের ওয়াকিবহাল থাকার উপর জোর দেন।
• 'দ্য হেরাল্ড’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক এবং বর্তমানে ভারত সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পরিকল্পনায় কর্মরত জেসুইট যাজক ফাদার জুলিয়ান দাস মন্তব্য করেন যে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা মুদ্রিত সংবাদমাধ্যম (Print Media) এমনকি অনলাইন পোর্টালগুলো পড়ায় খুব একটা আগ্রহী নয়। তারা এমন কিছু চায় যা বেশ আকর্ষণীয় (catchy) যেমন ইনস্টাগ্রাম বা টেলিগ্রামের আদলে তৈরি, অর্থাৎ আধুনিক ও ট্রেন্ডি। তিনি কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশের যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রয়োজনগুলো সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য একটি অর্ধ-দিবস ব্যাপী কর্মশালার আয়োজনেরও প্রস্তাব দেন।
• এই বিষয়ে ফ্যারেল শাহের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, মুদ্রিত বা অনলাইন সংবাদগুলো সংরক্ষণ (archive) করা যায় এবং ভবিষ্যতে প্রামাণ্য দলিল হিসাবে সেগুলি পেশ করা সম্ভব; কিন্তু ডিজিটাল মিডিয়া মূলত তাৎক্ষণিক প্রকৃতির হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকে না।
• সালেসীয়ান পুরোহিত ফাদার সরোজ মল্লিক দাবি জানান যে, ভবিষ্যতে কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশে আয়োজিত এই ধরনের সমাবেশে অতি অবশ্যই যেন প্রতিটি ‘ডিনারির’ (Deanery) প্রতিনিধিদের (যাঁরা ইংরেজি ভাষায় সাবলীল নন), ডাকা হয়।
•সাঁতরাগাছির বহু-সাংস্কৃতিক ও বহু-ভাষিক ধর্মপল্লী থেকে আগত মিডিয়া দলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক কিছু মতামত পাওয়া যায়। সেখানকার তরুণ-তরুণীরা যোগাযোগ মাধ্যমের অভিনব ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিগুলো কাজে লাগিয়ে যীশুর বাণী প্রচার করে চলেছে। এমনকি ‘হেরাল্ড’-এ ইংরেজিতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সংবাদগুলোও ধর্মপল্লীবাসীদের কাছে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, যাতে কলকাতা মহাধর্মপ্রদেশের ঘটনাবলি কারও অজানা না থাকে।
সর্বশেষে প্রস্তাব করা হয় যে, আর্চবিশপের অনুমোদন সাপেক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ক একটি চিন্তন গোষ্ঠী (Think Tank) গঠন করা হবে।
প্রতিবেদক - আইজ্যাক হ্যারল্ড গোমস্