পাকিস্তানের যাজক যৌন নির্যাতনের শিকার এক নারীর ন্যায়বিচার দাবিতে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন
যেখানে অনেকেই একজন যাজককে শুধু গির্জায় খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করতে দেখেন, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের রোমান ক্যাথলিক ধর্মপ্রদেশের ফাদার খালিল মাকসুদ, যিনি সামুন্দ্রির সেন্ট মেরী‘স ক্যাথলিক গির্জার দায়িত্বে আছেন , তিনি ন্যায়বিচারের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ধর্মীয় দায়িত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
৪৩৭- জিবি গ্রামটি, পাঞ্জাব প্রদেশের ফয়সালাবাদ জেলার সামুন্দ্রি এলাকার একটি কৃষিভিত্তিক এলাকা।সেখানে গত ৪ এপ্রিল ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে,১৬বছর বয়সী একটি মেয়ে নাম মুসকান ,চারজন পুরুষ দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। অপরাধীরা এই অশালীন ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
এই অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় ধর্মপল্লীর ফাদার মাকসুদ গির্জার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং, এই অসহায়দের পাশে থেকে তিনি নির্যাতনের শিকার নারী এবং তার পরিবারকে শারীরিক সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা উভয়ই প্রদান করেন।
নির্যাতনের শিকার মেয়েটির মামা হানুক মাসিহ ,যিনি ৪৮ বছর বয়সী অন্ধ ব্যক্তি, তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে আইনী ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষ সবসময়ই উপেক্ষিত হয়। এই আইনী প্রক্রিয়া তিনি ব্যর্থ হবেন বুঝতে পেরে ফাদার মাকসুদ নিজেই এগিয়ে আসেন। তিনি এই মামলা দায়ের করতে সহায়তা করেন এবং নিশ্চিত করেন যে কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
তবে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের, অক্টোবরে অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন জামিনে মুক্তি পায়। পরে তারা নির্যাতনের শিকার পরিবারটিকে হুমকি দেন , মামলা তুলে নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি ফাদার মাকসুদকে ও হুমকি দেওয়া হয়। তবে ফাদার তার দৃঢ় অবস্থানে অনড় ছিলেন এমনকি তিনি ঐ অসহায় পরিবার থেকে ও দূরে সরে যাননি।
ফাদার মাকসুদ বলেন, “এখানে আমার উপস্থিতি শুধু আইনি সহায়তার জন্য নয়; এটি প্রতিটি মানুষের প্রতি ঈশ্বরপ্রদত্ত মানবিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর একটি অবস্থান।”
ফাদার পুলিশি তদন্ত চলাকালীন সময়ে তাদের পাশে থাকতেন এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতেন। । সামাজিক চাপ ও ভয়ভীতির মুখেও পরিবারটি যেন টিকে থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে ওঠেন। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে মুসকান মানসিক আঘাত মোকাবিলা করার জন্য যেন কাউন্সেলিং পায়, যেন সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।
২০২৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল এই ঘটনা আরও গুরুতর হয়ে উঠে। তাই এই ঘটনার রেশ আজও বিদ্যমান। অভিযুক্তরা হানুকের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই হামলার পরে ফাদার নিজে এই পরিবারটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন এবং তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। এই পরিবারটি আজও ন্যায় বিচারের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আইনী মামলাটি আরো জোরদার করতে ক্যাথলিক এনজিও “খ্রিস্টান ট্রু স্পিরিট( সিটিএস)” তাদের সহায়তা দিচ্ছে। তবে ফাদারের পালকীয় যত্ন এবং আইনী সহায়তার এই যৌথ উদ্যোগ পরিবারটিকে বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে সক্ষমতা দান করছে।
হানুক মাসিহ বলেন “ আমি অন্ধ এবং অন্ধকারের জগতে বাস করি, কিন্তু ফাদার মাকসুদ আমার চোখ হয়ে উঠেছেন। যখন আগুন আমার ঘর পুড়িয়ে দিল হুমকি আমার শান্তি কেড়ে নিল, তখন তিনিই আমার পাশে ছিলেন। তাকে ছাড়া আমি অনেক আগেই নিশ্চুপ হয়ে যেতাম।”
সিটিএস-এর প্রধান নির্বাহী আশের সারফরাজ এই ফাদারের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “এই ঘটনায় আমরা যা দেখছি, তা হলো মণ্ডলীতে সামাজিক শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ। হুমকি সত্ত্বেও ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে ফাদার খালিল মাকসুদ দেখিয়েছেন যে ন্যায়বিচারের পাশে দাঁড়ানো মণ্ডলীর পালকীয় কাজের একটি অপরিহার্য অংশ।”
গ্রাম ৪৩৭-এ পোড়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষ সহিংসতার এক স্পষ্ট স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, আর ফাদার মাকসুদের পদক্ষেপগুলো অসহায় মানুষের মর্যাদা রক্ষায় তার পালকীয় সেবা কাজের প্রতিফলন ঘটিয়ে উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করছে। - আরভিএ সংবাদ