কার্ডিনাল ফেরাঁওর আহ্বান: এশিয়ার মণ্ডলীতে সিনোডাল জীবনচর্চা গড়ে তুলুন
গত ২১ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, জাকার্তায় এশিয়ার প্রতিটি ধর্মপল্লী, ধর্মপ্রদেশ, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও পরিবারে সিনোডালিটি কেবল আলোচনার বিষয় না থেকে জীবনযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে হবে—এমন আহ্বান জানিয়েছেন ফেডারেশন অব এশিয়ান বিশপস’ কনফারেন্স (FABC)-এর সভাপতি কার্ডিনাল ফিলিপে নেরি ফেরাঁও। জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এফএবিসির ১২তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
সমবেত বিশপ ও প্রতিনিধিদের উদ্দেশে কার্ডিনাল ফেরাঁও বলেন, এই অধিবেশন কেবল একটি সাংগঠনিক সভা নয়; বরং এটি সম্মিলিতভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুধাবনের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা।
তিনি বলেন, “আমরা এখানে শুধু এশিয়ার মণ্ডলীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে আসিনি; বরং ঈশ্বর তাঁর জনগণের জন্য কী চান, তা একসঙ্গে অনুধাবন করতেই আমরা সমবেত হয়েছি।”
এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—“সিনোডাল রূপান্তরের আহ্বান এবং এশিয়ায় সেতু ও সেতুবন্ধনকারী হওয়ার মিশন”—নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এই প্রতিপাদ্য সিনোড অন সিনোডালিটির আলোকে শ্রবণ, অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত বিচক্ষণতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মণ্ডলীর অঙ্গীকারকে প্রকাশ করে।
কার্ডিনাল ফেরাঁও জোর দিয়ে বলেন, সিনোডালিটি কোনো নতুন পালকীয় কর্মসূচি বা প্রশাসনিক সংস্কার নয়।
তিনি বলেন, “আমাদের সামনে প্রকৃত প্রশ্ন হলো—সিনোডালিটি গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা নয়; বরং কীভাবে এটি আমাদের ধর্মপ্রদেশ, ধর্মপল্লী, প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং পরিবারে কতটুকু গুরুত্ব রাখতে পারে তা লক্ষ্য রাখা।”
নিজের বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, মণ্ডলীর মিশনের সূচনা হয় সাক্ষাতের মাধ্যমে। যোহনের সুসমাচারে ফিলিপের ন্যাথানিয়েলকে “এসো এবং দেখো” আহ্বানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সুসমাচার প্রচারের ভিত্তি তর্কে জয়ী হওয়া নয়; বরং মানুষকে যিশু খ্রিস্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানো।
তিনি আরও বলেন, এই একই চেতনা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত, যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিশপরা একত্রিত হয়ে প্রার্থনা, শ্রবণ, বিচক্ষণতা এবং নিজ নিজ স্থানীয় মণ্ডলীর পালকীয় অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন।
কার্ডিনাল ফেরাঁও বলেন, “প্রার্থনা, সংলাপ এবং সম্মিলিত বিচক্ষণতা কেবল অধিবেশনের কর্মসূচির অংশ নয়; এগুলোই সিনোডালিটির প্রকৃত প্রকাশ।”
এশিয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলেন, প্রাচীন সভ্যতা, বহুমাত্রিক সংস্কৃতি এবং প্রধান প্রধান ধর্মীয় ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই মহাদেশ মণ্ডলীর সামনে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জও উপস্থিত করেছে।
তিনি বলেন, “এশিয়ার মণ্ডলীকে সেতু এবং সেতুবন্ধনকারী—উভয় ভূমিকাই পালন করতে হবে।” এ লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে সংলাপ, পুনর্মিলন এবং ঐক্য জোরদারের আহ্বান জানান।
কার্ডিনাল ফেরাঁও আরও উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, অভিবাসন, পরিবেশের অবক্ষয়, বৈষম্য এবং সশস্ত্র সংঘাত এশিয়ার বাস্তবতাকে গভীরভাবে পরিবর্তন করছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ খ্রিস্টীয় আশাকে দুর্বল করে না; বরং সংহতি, সহমর্মিতা এবং নবায়িত মিশনারি অঙ্গীকারের মাধ্যমে মণ্ডলীকে আরও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানায়।
সপ্তাহব্যাপী এই পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের দিকে তাকিয়ে তিনি অংশগ্রহণকারীদের প্রতি পবিত্র আত্মার পরিচালনার প্রতি সর্বদা মনোযোগী থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, অধিবেশন শেষে প্রকাশিত চূড়ান্ত দলিলটি যেন কেবল আলোচনার সারসংক্ষেপ না হয়ে, এশিয়ার স্থানীয় মণ্ডলীগুলোকে বাস্তব জীবনে সিনোডালিটি চর্চায় সহায়তা করার জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদন উপস্থাপন, আলোচনা কিংবা সুপারিশ গ্রহণের আগে এই অধিবেশনের প্রধান দায়িত্ব হলো—আজকের এশিয়ার মণ্ডলীর কাছে ঈশ্বর কী প্রত্যাশা করছেন, তা একসঙ্গে বিচক্ষণতার সঙ্গে অনুধাবন করা।
বক্তব্যের সমাপ্তিতে কার্ডিনাল ফেরাঁও বলেন, এফএবিসির ১২তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের প্রকৃত সাফল্য চূড়ান্ত দলিলের মাধ্যমে নয়; বরং জাকার্তা থেকে নিজ নিজ স্থানীয় মণ্ডলীতে ফিরে গিয়ে অংশগ্রহণকারীরা যদি পবিত্র আত্মার প্রতি আরও মনোযোগী হন, পরস্পরের প্রতি আরও নিবেদিত থাকেন এবং সমগ্র এশিয়ায় প্রকৃত সেতুবন্ধনকারী হিসেবে কাজ করেন—তবেই এই অধিবেশনের উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করবে।
