জিপিএইচ তৃতীয় দিন: কার্ডিনাল অ্যাম্বো ডেভিডের আহ্বান — “যীশু যেন আমাদের মধ্যে ও আমাদের মাধ্যমে আবার প্রকাশিত হন”

মালয়েশিয়ার পেনাং-এ অনুষ্ঠিত ‘গ্রেট পিলগ্রিমেজ অব হোপ’-এর তৃতীয় দিনে (২৯ নভেম্বর), ফিলিপিনো প্রিলেট পাবলো ভারজিলিও এস. কার্ডিনাল ডেভিড—কালুকানের বিশপ, এফএবিসির সহ-সভাপতি এবং সিবিসিপির প্রেসিডেন্ট— একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সকলের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি এশিয়ার খ্রীষ্টভক্তদের আহ্বান জানান গল্প বলার সেই নিপুন শিল্পকে পুনরুদ্ধার করতে—যা খ্রীষ্টীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু এবং ২০৩৩ সালের মহা জুবিলির পথে এগিয়ে চলার অন্যতম উপায়।

পেনাং-এর দ্য লাইট হোটেলের বলরুমে সমবেত হওয়া ৯০০-রও বেশি প্রতিনিধি দলের উদ্দেশে তিনি “যীশুর গল্পে জীবনযাপন ও তা ভাগ করে নেওয়া —এশিয়ার জনগণের সাথে ২০৩৩-এর পথে তীর্থযাত্রা” শীর্ষক বিষয়বস্তুর উপর বক্তব্য রাখেন। বাইবেলের লুক রচিত মঙ্গল সমাচারের ২৪ অধ্যায় ইম্মাউসের কাহিনি থেকে তিনি তুলে ধরেন এমন এক বিশ্বাস-সহভাগিতার দৃষ্টিভঙ্গি, যা পারস্পরিক সম্পর্ক, মানবিকতা এবং খ্রীষ্টের পুনরাবির্ভাবের ওপর ভিত্তি করে রচিত।

যীশু কেন অদৃশ্য হলেন?”

কার্ডিনাল ডেভিড তাঁর বক্তৃতার শুরু করেন একটি প্রশ্ন দিয়ে—যা তাঁকে বহু বছর ধরে ভাবিয়েছে: ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন দুই শিষ্য রুটি ভাঙার সময় যীশুকে চিনতে পারল, তখন কেন তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন?

ইম্মাউসের কাহিনি পুনরায় বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যীশু প্রথমে একজন অপরিচিত হিসাবে দুই নিরাশ শিষ্যের কাছে এগিয়ে আসেন। তিনি শুরুতেই তাদের উপদেশ দেননি, বরং “তাদের গল্প শোনেন, তাদের সঙ্গে হাঁটেন এবং তাদের কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করেন।”

কার্ডিনাল বলেন, “আমাদের ঈশ্বরই সিনোডাল পথের উপযুক্ত নিদর্শন। তিনি নিজেই উদ্যোগ নেন, মানুষের কাছে এগিয়ে আসেন, তাঁদের সঙ্গে হাঁটেন, তিনি কথা বলার আগে অন্যদের কথা আগে শোনেন।”

শিষ্যদের চেনার মুহূর্তে—যখন যীশু রুটি নেন, আশীর্বাদ করেন ও ভাঙেন—তা গুরুত্বপূর্ণ শুধুমাত্র রীতির জন্য নয়, বরং একজন অতিথির পক্ষে এটি করার কথা নয় অথচ আতিথেয়তা ও মিলনের এই নিদর্শনীই যীশুর অচিন্ত্য স্বকীয়তা

কিন্তু শিষ্যরা যখন তাঁকে চিনল, তখনই তিনি কেন অদৃশ্য হলেন?

কার্ডিনাল ডেভিড উত্তর দেন:
“তিনি অদৃশ্য হলেন যাতে তিনি তাদের মধ্যে এবং তাদের মাধ্যমে আবার প্রকাশিত হতে পারেন। তিনি আজও আমাদের মধ্য দিয়ে উপস্থিত হন, অদৃশ্য হন, এবং আবার প্রকাশিত হন।”

এই সত্যই খ্রীষ্টের আহ্বানের মূল: দূর থেকে যীশুর দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং বিশ্বের মাঝে তাঁর উপস্থিতি হয়ে ওঠা।

যীশুর গল্প ভাগ করে নেওয়া: এশিয়ার পথ

মূলপ্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশে তিনি এশীয়দের স্বনিজস্বতায় সুসমাচার ভাগ করে নেওয়ার কথা বলেন।

কার্ডিনাল ডেভিড বলেন, “এশিয়ায় সুসমাচার প্রচার মানে গল্প বলা, জয় করা নয়।”

তিনি স্বীকার করেন যে অতীতে বলপ্রয়োগ বা উপনিবেশিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রচারের কারণে অনেক সংঘাত তৈরি হয়েছে

আজ এশিয়ায় আমাদের যাত্রা শুরু হয়—

  • সম্পর্কের মাধ্যমে
  • গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণের মাধ্যমে
  • গল্প বিনিময়ের মাধ্যমে
  • সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সুসমাচার কেবল “সদিচ্ছার উর্বর মাটিতে” বেড়ে ওঠে। তাই মানুষকে নিয়ে হাঁটা এবং তাদের গভীরতম প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া হল নম্রতার সাথে—ই সুসমাচারের পথে চলা যীশু নিজেও বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করতেন ।

কার্ডিনাল ডেভিড এফএবিসির সিনোডাল পথচলার চারটি স্তম্ভের সঙ্গেও এটি যুক্ত করেন—

. সংস্কৃতি – স্থানীয় শিল্প, সঙ্গীত, আচার, সাহিত্য এবং পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে বিশ্বাসের প্রকাশ

. ধর্ম – বন্ধুত্ব ও সংলাপের মাধ্যমে সেতুবন্ধন তৈরি

. দরিদ্র – সহানুভূতির স্পর্শে       আহত মানুষদের মাঝে খ্রীষ্টকে খুঁজে পাওয়া

. সৃষ্টি – পৃথিবীর আর্তনাদ ও দরিদ্রের কান্না শোনার মাধ্যমে আমাদের ‘সাধারণ গৃহ’ রক্ষা করা

২০৩৩-এর পথে যাত্রা—একটি আশার তীর্থযাত্রা

খ্রীষ্টমন্ডলী যখন ২০৩৩—খ্রীষ্টের মৃত্যু যন্ত্রণা ও পুনরুত্থানের ২০০০ বছর—উপলক্ষে প্রস্তুতি নিচ্ছে, কার্ডিনাল ডেভিড তখন স্মরণ করিয়ে দেন যে মহা জুবিলি কেবল অতীতের কথা স্মরণ করা নয়।

তিনি বলেন,
“এটি এমন একটি গল্পের উদ্‌যাপন, যা এখনও লেখা হচ্ছে। আমরা সেই পথের শিষ্য—কখনও হতাশ, কখনও বিভ্রান্ত, কিন্তু সবসময় খুঁজে চলেছি।”

তিনি উল্লেখ করেন, এশিয়ায় হয়তো বিশাল ক্যাথেড্রাল নেই, কিন্তু এখানে আছে—

  • সম্প্রীতির গল্প
  • সহনশীলতার গল্প
  • আতিথেয়তার গল্প
  • করুণা ও আশার গল্প

এই গল্পগুলিই এশিয়ার কাছে সুসমাচারকে নতুনভাবে, নিরাময়কারী উপায়ে ভাগ করে নেওয়ার বিশেষ শক্তি দেয়।

শেষে তিনি ইম্মাউসের কাহিনিকে ২০৩৩-এর তীর্থযাত্রার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে বলেন—

  • ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে হাঁটেন—অদৃশ্যভাবে
  • কথা বলার আগে শোনেন
  • আশার আগুন জ্বালান ও আমাদের চোখ খুলে দেন
  • রুটি ভাঙেন যেন আমরা পৃথিবীর জন্য তাঁর দেহ হয়ে উঠি
  • এবং অদৃশ্য হন, যাতে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আবার প্রকাশিত হতে পারেন

কার্ডিনাল ডেভিডের কথায়,
“এটাই আমাদের ২০৩৩-এর করণীয় কর্তব্য— যেন যীশু আমাদের কথা, আমাদের আচরণ, আমাদের সম্প্রদায়, এবং আমাদের এশীয় সুসমাচার-বর্ণনার মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হন।”

প্রতিবেদন - রেডিও ভেরিতাস এশিয়া

অনুলিখন  - তেরেজা রোজারিও