থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ের চোমথং-এ অনুষ্ঠিত হলো আইএমসিএস গ্লোবাল চ্যাপ্লেন অ্যান্ড এনিমেটরস ফরমেশন প্রোগ্রাম
গত ১২ থেকে ২০ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ের চোমথং-এ অবস্থিত প্যাক্স রোমানা লাউদাতো সি’ সেন্টারের অনুষ্ঠিত হলো আইএমসিএস গ্লোবাল চ্যাপ্লেন অ্যান্ড এনিমেটরস ফরমেশন প্রোগ্রাম।
“আশায় একসাথে পথ চলা” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই আট দিনব্যাপী অনুষ্ঠানটি প্রার্থনা, আত্মগঠন, সংলাপ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
চারটি মহাদেশের (এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা) ১৪টি দেশের প্রতিনিধি দলটিতে ছিলেন ১৫ জন চ্যাপ্লেন, ৪ জন লে-চ্যাপ্লেন/এনিমেটর, ২০ জন ছাত্রনেতা এবং ৫ জন সহযোগী।
দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, হংকং, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি এবং পোল্যান্ড।
বাংলাদেশ থেকে সাতজন প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। আধ্যাত্মিক উপাসনা উদযাপন, স্থানীয় সম্প্রদায়ে সাহচর্য এবং যৌথ কর্মশালার মাধ্যমে এই সম্মেলন উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ, বিশ্বাসে বলীয়ান নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং বিশ্বব্যাপী সংহতি জোরদার করার আইএমসিএস-এর লক্ষ্যকে পুনর্নিশ্চিত করেছে।
প্যাক্স রোমানা - ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট অফ ক্যাথলিক স্টুডেন্টস, আইওয়াইটিসি, ‘কমিউনাল লাইফ অফ লাভ অ্যান্ড ইউনিটি অফ দ্য মাউন্টেন পিপল’ ফাউন্ডেশন, লাইফ স্কিল একাডেমি এবং ক্যাথলিক স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক অফ থাইল্যান্ড এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সরাসরি ও অনলাইনে সর্বমোট ৪৪ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
চ্যাপ্লেনস অ্যান্ড এনিমেটরস ফরমেশন অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ উদ্যোগটি আইএমসিএস প্যাক্স রোমানার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপ্লেন, মণ্ডলীর সহকারী এবং সাধারণ এনিমেটরদের এক ছাদের নিচে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পালকীয় পরিচর্যায় নতুন ধারার সূচনা করে।
সাহচর্য বা পাশে থাকার মূলভিত্তি হলো ‘মনোযোগ দিয়ে শোনা’ এই বিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গ্লোবাল ক্যাফে অংশগ্রহণকারীদের পবিত্র শাস্ত্র, কাথলিক মণ্ডলীর সামাজিক শিক্ষা, এবং পোপের গুরুত্বপূর্ণ দলিলসমূহ (যেমন: ক্রিস্তুস ভিভিত, ইভানজেলি গাউদিউম, লাউদাতো সি’, মানিফিকা হিউম্যানিতাস, এবং দিলেক্সি তে) এর আলোকে শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করতে আহ্বান জানায়।
প্যাক্স রোমানার কর্মভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা হলো দেখা, বোঝা, ধর্মতাত্ত্বিক ধ্যান, অনুধাবন এবং পদক্ষেপ এর দ্বারা পরিচালিত হয়ে, এই কর্মসূচি নেতাদের ডিজিটাল রূপান্তর, অভিবাসন, দারিদ্র্য, সংঘাত এবং সৃষ্টিজগতের যত্ন নেওয়ার মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সহমর্মিতার সাথে মোকাবেলা করার শক্তি জুগিয়েছে।
চূড়ান্তভাবে, গ্লোবাল ক্যাফে নিশ্চিত করেছে যে সাহচর্য কেবল একটি পালকীয় পদ্ধতি নয়, বরং সুসংবাদের একটি জীবন্ত প্রকাশ: ধৈর্য ধরে তরুণদের পাশে হাঁটা, সহানুভূতির সাথে শোনা এবং আশার বার্তা নিয়ে সেবা করা।
ক্যাথলিক মণ্ডলীর দুজন শীর্ষ স্থানীয় নেতার বার্তা এই কর্মসূচিকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে: কার্ডিনাল কেভিন জে. ফারেল (ডিকাস্ট্রি ফর লেয়িটি, ফ্যামিলি অ্যান্ড লাইফ-এর প্রিফেক্ট): তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে মণ্ডলীর প্রধান দায়িত্ব হলো তরুণদের খ্রীষ্টে বিশ্বাস রেখে উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করা।
তিনি আরো বলেন, “তরুণরা ছোট কোনো বিষয়ে আকৃষ্ট হয় না, তারা কেবল মহৎ আদর্শ, মহান সত্য এবং মহান মিশন দ্বারা আকৃষ্ট হয়।” কার্ডিনাল সেবাস্তিয়ান ফ্রান্সিস (পেনাংয়ের বিশপ) তিনি গ্লোবাল ক্যাফেকে মণ্ডলীর সর্বজনীনতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের সুসংবাদ ও ক্যাথলিক সামাজিক শিক্ষায় মূল্যায়িত ‘মিশনারি শিষ্য’ হওয়ার আহ্বান জানান।”
তিনি বলেন, “একটি ‘গ্লোবাল’ আন্দোলন হিসেবে আইএমসিএস প্যাক্স রোমানার শক্তি নির্ভর করে আপনাদের গভীর আত্মগঠন, সময়ের লক্ষণ চেনার ক্ষমতা এবং সুসংবাদ ও সামাজিক শিক্ষার আলোকে তা অনুধাবন করার ওপর।”
আইএমসিএস প্যাক্স রোমানার আন্তর্জাতিক সভাপতি উইলিয়াম নকরেক এই সম্মেলনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমরা একটি বিশ্বাস নিয়ে গ্লোবাল ক্যাফে শুরু করেছিলাম: যদি আমরা একটি উন্নত ক্যাথলিক ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই, তবে যারা তরুণদের পাশে হাঁটেন তাদের আগে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এই এক সপ্তাহে আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখেছি, প্রার্থনা করেছি এবং তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনেছি। এখন ঘরে ফিরে আমরা যা চিন্তা করেছি তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।”
প্যাক্স রোমানার আন্তর্জাতিক চ্যাপ্লেন ফাদার জোজো এম. ফাং, এসজে বলেন, “এই সপ্তাহজুড়ে আমরা আবারও অনুধাবন করেছি যে পাশে থাকার যাত্রা শুরু হয় শোনার মাধ্যমে। কথা বলার আগে আমাদের তরুণদের গল্প, সংগ্রাম, প্রশ্ন এবং আশা শুনতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা যখন ধৈর্যের সাথে তাদের পাশে হাঁটি, তখন তারা বুঝতে পারে যে ঈশ্বর ইতিমধ্যেই তাদের জীবনে বিদ্যমান।”
বাংলাদেশ ক্যাথলিক স্টুডেন্টস মুভমেন্টের চ্যাপ্লেন ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি বলেন, “ক্যাফে ক্রস-বর্ডার বা আন্তঃসীমান্ত যুব পরিচর্যার মাধ্যমে আমাদের পালকীয় দক্ষতা বাড়ানোর একটি রূপান্তরমূলক সুযোগ করে দিয়েছে।”
তিনি উল্লেখ করেন যে, সিনোডাল পদ্ধতি সাধারণ ছাত্র নেতৃত্বকে ক্ষমতায়িত করে এবং চ্যাপ্লেনদের গভীর সহানুভূতি ও স্পষ্টতার সাথে তরুণদের পরিচালনা করতে প্রস্তুত করে।
বিসিএসএম-এর এনিমেটর ব্লেস কোড়াইয়া প্রথমবার ক্যাফে-তে অংশ নিয়ে তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “গ্লোবাল ক্যাফে আমাকে শিখিয়েছে যে প্রকৃত সাহচর্য বা পাশে থাকা মানে উত্তর দেওয়া নয়, বরং মনোযোগ দিয়ে সহানুভূতি সহকারে শোনা। ডিজিটাল পরিবেশ থেকে জলবায়ু উদ্বেগ তরুণদের এই বাস্তবতার কথা শুনে আমি বুঝেছি যে আমাদের তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
অংশগ্রহণকারীরা ক্যাথলিক মণ্ডলীল সামাজিক শিক্ষা প্রচার, আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ‘আইএমসিএস পাস্টোরাল হ্যান্ডবুক’ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।
রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের চ্যাপ্লেন ফাদার প্রশান্ত কুমার আইন্ড তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি আমার ধর্মপ্রদেশীয় আন্দোলনে ফিরে যাচ্ছি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, নতুন আধ্যাত্মিক শক্তি এবং একটি বিশ্বব্যাপী সমর্থনের নেটওয়ার্ক নিয়ে।”
তিনি আরো বলেন, “এই অভিজ্ঞতা পুনরায় প্রমাণ করেছে যে চ্যাপ্লেন হওয়া একটি মহান আহ্বান কারণ শিক্ষার্থীদের পাশে ধৈর্যের সাথে হাঁটা এবং তাদের দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসী নেতা হিসেবে গড়ে তোলা।”
অংশগ্রহণকারীরা তাদের নিজ নিজ জাতীয় ও ক্যাম্পাস পর্যায়ের ছাত্র আন্দোলনগুলোকে নতুন করে সাজানোর জন্য সুনির্দিষ্ট টুলকিট বা কৌশল নিয়ে এই কর্মসূচির সমাপ্তি টানেন।
প্রধান ফলাফলের মধ্যে রয়েছে শান্তি, ন্যায়বিচার ও পরিবেশ রক্ষায় আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শক্তিশালী মানসিক ও আধ্যাত্মিক সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই অভিজ্ঞতা “দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া” এবং সেবামূলক নেতৃত্বের মূলনীতিকে পুনর্নিশ্চিত করেছে। একই সাথে, এটি ‘সিনোড অন সিনোডালিটি’র একটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে সাধারণ সদস্য ও যাজকমণ্ডলীকে সমান মর্যাদায় রেখে মণ্ডলীর দায়িত্বশীল কাঠামোর একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। - ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি
