সংলাপ ও মানুষের জীবন থেকে বিকশিত হোক এশিয়ার ধর্মতত্ত্ব: এফএবিসি

গত ২১ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, এফএবিসির ১২তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তর জানায়, এশিয়ার ধর্মতত্ত্ব মানুষের বাস্তব জীবন ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।

গত ২১ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার হোটেল মুলিয়ায় অনুষ্ঠিত এফএবিসির (ফেডারেশন অব এশিয়ান বিশপসকনফারেন্স) ১২তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এফএবিসির ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তর (Office of Theological Concerns-OTC) জানিয়েছে, এশিয়ার ধর্মতত্ত্ব কেবল শ্রেণিকক্ষ বা একাডেমিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অভিজ্ঞতা বাস্তবতা থেকে বিকশিত হতে হবে।

দপ্তরের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইন্দোনেশিয়ার পাংকাল পিনাং ধর্মপ্রদেশের বিশপ এবং এফএবিসির ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তরের চেয়ারম্যান বিশপ আদ্রিয়ানুস সুনারকো, ওএফএম। তিনি বলেন, ধর্মতত্ত্বের কাজ হলো মানুষের কথা শোনা, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপ গড়ে তোলা এবং এশিয়ার বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় ঈশ্বরের আহ্বানকে অনুধাবন করে মণ্ডলীর মিশনকে এগিয়ে নেওয়া।

তিনি ধর্মতাত্ত্বিকদের কেবল গবেষক হিসেবে নয়, বরং ঈশ্বরের জনগণের সহযাত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় বৈচিত্র্য, প্রাচীন সংস্কৃতি, দ্রুত আধুনিকায়ন এবং নানা সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ এশিয়ার বাস্তবতায় সুসমাচারের বার্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, তা বুঝতে ধর্মতাত্ত্বিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এফএবিসি বিশ্বাস করে আসছে যে, এশিয়ার মণ্ডলীকে এশিয়ার জনগণ, সংস্কৃতি ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ভাষা গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্য অঞ্চলে গড়ে ওঠা ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা শুধু গ্রহণ করলেই চলবে না। বরং স্থানীয় মণ্ডলীর জীবন-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এমন ধর্মতত্ত্ব গড়ে উঠতে হবে, যা একই সঙ্গে ক্যাথলিক মণ্ডলীর সর্বজনীন ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। দ্বিতীয় ভ্যাটিকান মহাসভার Ad Gentes দলিলের অনুপ্রেরণায় এফএবিসির ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তর বিভিন্ন দেশের বিশপ সম্মেলনকে তাদের নিজস্ব পালকীয় সাংস্কৃতিক বাস্তবতার আলোকে ধর্মতত্ত্ব বিকাশে উৎসাহিত করে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটি দপ্তরের যৌথ উদ্যোগের বিষয়টিও তুলে ধরে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং হংকংসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ধর্মতাত্ত্বিকদের সমন্বয়ে এই দপ্তর মহাদেশব্যাপী ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা বিচক্ষণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

এফএবিসির ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তরের চেয়ারম্যান বিশপ আদ্রিয়ানুস সুনারকো, ওএফএম, দপ্তরের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, প্রার্থনা, পবিত্র খ্রিস্টযাগ, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মিলন এবং পারস্পরিক শ্রবণের মধ্য দিয়েই প্রকৃত ধর্মতত্ত্ব বিকশিত হয়।

গত দুই দশকে দপ্তরটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবজীবনের মর্যাদা, পরিবেশ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় মণ্ডলীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত The Asian Face of Synodality (FABC Papers 191) গ্রন্থে এশিয়ার সাংস্কৃতিক, সামাজিক ধর্মীয় বাস্তবতার আলোকে সিনোডাল যাত্রার বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রকাশনার পেছনের প্রক্রিয়াটিও সিনোডাল। গবেষণা শুরুর আগে ধর্মতাত্ত্বিকরা প্রার্থনা, নীরব ধ্যান সম্মিলিত বিচক্ষণতার মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন। এরপর গবেষণা, খসড়া বিনিময় এবং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিকেই দপ্তর সিনোডাল ধর্মতত্ত্বচর্চা হিসেবে অভিহিত করেছে।

প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইম্মাউসের পথে দুই শিষ্যের সুসমাচারের ঘটনাকে তুলে ধরা হয়। সেখানে মণ্ডলীকে আহ্বান জানানো হয়কোমল হৃদয়, শীতল দৃষ্টি স্থবির পদক্ষেপ থেকে বেরিয়ে এসে খ্রিস্টের উপস্থিতিতে প্রজ্বলিত হৃদয়, উন্মুক্ত দৃষ্টি এবং মিশনের জন্য প্রস্তুত পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে।

দপ্তরের মতে, সিনোডালিটি কেবল মণ্ডলী পরিচালনার একটি নতুন পদ্ধতি নয়; বরং এটি এমন একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর, যা মণ্ডলীকে খ্রিস্টের সঙ্গে পথচলা এক বিশ্বাসী সম্প্রদায়ে পরিণত করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকৃত ধর্মতত্ত্ব কেবল গবেষণার মাধ্যমে নয়; বরং যৌথ প্রার্থনা, পবিত্র খ্রিস্টযাগ, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মিলন এবং একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মধ্য দিয়েও বিকশিত হয়। এসব অভিজ্ঞতাই প্রকৃত ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিফলনের দৃঢ় ভিত্তি।

তোমরা এর চেয়েও মহত্তর বিষয় দেখতে পাবে” (যোহন :৫০): সিনোডাল রূপান্তর এবং এশিয়ায় সেতু সেতুবন্ধনকারী হওয়ার মিশনএই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চলমান এফএবিসির ১২তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ক দপ্তর পুনর্ব্যক্ত করেছে, তারা এমন এক স্বতন্ত্র এশীয় ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা কথা বলার আগে শোনে, শিক্ষা দেওয়ার আগে শেখে এবং সুসমাচার ঘোষণার পথে এশিয়ার মানুষের পাশে থেকে পথচলা অব্যাহত রাখে।

Bengali pop up image