সিলেট লক্ষিপুর ক্যাথিড্রাল গীর্জায় উদযাপিত হলো খাসি খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব জিংয়াসেং

লক্ষিপুর ক্যাথিড্রাল গীর্জায় উদযাপিত হলো খাসি খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব জিংয়াসেং

গত ২১ নভেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বাংলাদেশ খাসি ক্যাথলিক রাংবাবালাং এসোসিয়েশন আয়োজনে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা লক্ষিপুর ক্যাথিড্রাল  গীর্জায় একদিন ব্যাপি পালন করা হয় এই ধর্মীয় জিংয়াসেং(খ্রিষ্ট রাজা পর্ব) উৎসবটি।

ঐতিহ্যগত পোশাকে পরিধান করে খাসি তরুণী সাজ-সাজ রবে  পরিবেশন করেন গান ও শোভাযাত্রা মধ্যদিয়ে  আরম্ভ হলো পর্বের মূল ধর্মীয় খ্রিষ্টযাগ।

এই জিংয়াসেং উপস্থিত থেকে খ্রিস্টযাগ  উৎসর্গ করেন সিলেট খ্রিষ্টান  ক্যাথলিক ধর্মপ্রদেশের বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস  গমেজ, খ্রিষ্টযাগে উপস্থিত থেকে সহযোগীতা করেন কুলাউড়া লক্ষিপুর ক্যাথলিক মিশনের প্রধান যাজক ফাদার ভেলেন্টাই তালাং,ফাদার যোসেফ গমেজ ওএমআইসহ সিলেট ধর্মপ্রদেশের অধীনে সকল মিশনের ফাদারগণ উপস্থিত ছিলেন।

বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস গমেজ তার উপদেশ বালীতে বলেন, “যীশু মৃত্যুবরণ করেছেন ক্রুশে, লজ্জাজনক। যেটা মনে হতে পারে পরাজিত কিন্তু তিনি পরাজিত না। পুনরুত্থানের মধ্যদিয়ে তিনি দেখিয়েছেন তিনি কিভাবে বিজয়ী প্রভু, তিনি রাজা”।

“যীশু সেই রাজা যিনি সকল রাজার চেয়ে শক্তিশালী। তার রাজত্ব কখনোও শেষ হবেনা। সেটি তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন মানুষের জীবনে-অন্তরে। তিনি আমাদের হৃদয়ের দৃষ্টি খোলতে চান, আমাদের হৃদয়ে এসে কথা বলতে চান। কিন্তু আমরা মানুষ যদি হৃদয়কে উম্মোক্ত করতে না পারি, যীশু আমাদের কি বলতে চান তা শোনার চেষ্টা ও না করি? তাহলে তিনি কিভাবে আসবেন?”, বলেন বিশপ শরৎ

বিশপ আরো বলেন, সুতরাং আজকের দিনে আমাদের গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে। খ্রিস্ট রাজাকে আমাদের হৃদয়ে গ্রহন করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে। সব বাধা কে দূর করতে হবে। তাহলেই এই রাজার রাজত্বে আমরা অংশী হতে পারব। 

কারিতাস সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ও বাংলাদেশ খাসি কাথলিক রাংবাবালাং এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মি.বনিফাস খংলা বলেন, এই বছর আমরা ৬০তম এই ধর্মীয় উৎসব পালন করছি। প্রত্যেক বছর আমরা পালাক্রমে বিভিন্ন খাসি পুঞ্জি(পল্লী)তে মহাসমারোহে পালন করে থাকি, কিন্তু গতবছর আমরা কোভিড-১৯ কারণে এই ধর্মীয় উৎসবটি পালন করতে পারিনি। তাই এবছর সীমিত আকারে উদযাপন করতে পারায় আমরা খ্রিস্টরাজের প্রতি কৃতজ্ঞ।

মিস মিকি সুমের তার অনুভূতিতে বলেন, এই ধরনের জিংয়াসেং আমাদের খাসিয়াদের জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা সব খাসিয়ারা মিলিত হয়। একত্রে দেশ, জাতি, সমাজ ও শান্তির জন্য খ্রিস্ট রাজার কাছে প্রার্থনা করার সুযোগ পাই। তাছাড়া যেহেতু সব খাসিয়ারা এখানে উপস্থি হয়, এটা একধরনের মিলন বন্ধন ও বটে। 

১৯৭৬ সালে স্বর্গীয় ফাদার হেরমান ডরিনালার নেতৃত্বে এবং সিস্টার মিডা জন মেরী ভিয়ান্নী, আরএনডিএম এর সহযোগিতায় বড়লেখা উপজেলার মাধবকুন্ড খাসিয়া পুঞ্জিতে (খাসিয়া পল্লী) বাংলাদেশে বসবসাসরত খাসিয়া কাথলিকদের সম্পৃক্ত ও মণ্ডলীর কার্যক্রম শক্তিশালী করার লক্ষ্যে “বাংলাদেশ খাসি কাথলিক রাংবাঃ বালাং এসোসিয়েশন” গঠন করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সালে সংগঠন চূড়ান্তভাবে গঠন না করলেও রাংবাঃ বালাংদের নেতৃত্বে রাজনগর উপজেলা ইনাই পুঞ্জিতে প্রথমবার পাস্কা পর্ব উদযাপন করা হয়।

সেই আলোকে ১৯৯৭ সালে কুলাউড়া উপজেলার মেঘাটিলা পুঞ্জিতে একটি বিশেষ সভা করা হয়। এই সভা থেকেই সকলের সম্মতিতে সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সম্পাদক পদ সৃষ্টি করে “বাংলাদেশ খাসি কাথলিক রাংবাঃ বালাং এসোসিয়েশন” এর কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়।

এই সংগঠন বাংলাদেশে অবস্থিত খাসি পুঞ্জির খাসিদের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার কাজে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। রাংবাঃ বালাং শব্দটিকে ব্যবচ্ছেদ করলে দাঁড়ায়: রাংবাঃ এর অর্থ প্রধান এবং বালাং এর অর্থ মণ্ডলী।

অতএব, খাসিয়া পুঞ্জিভিত্তিক বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা, ধর্ম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজকর্ম পরিচালনার জন্য পুঞ্জির খ্রিস্টভক্তদের দ্বারা মনোনীত প্রধানই হচ্ছেন “রাংবাঃ বালাং”।

খাসিয়াদের প্রতিটি পুঞ্জি বা পল্লীতে একজন করে রাংবাঃ বালাং থাকেন যিনি রোবারদিন সহ অন্যন্যা দিনে সংঘঠিত বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনা পরিচালনা করেন, ছেলে-মেয়ে, পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় অনুশাসন পালনে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করেন।

বাংলাদেশ খাসি কাথলিক রাংবাঃ বালাং এসোসিয়েশন উদ্দেশ্য হলো; ১। মণ্ডলীর কার্যক্রমকে প্রসার করা ২। জিংয়াসেং আয়োজন করা (খ্রিস্টরাজা ও পাস্কা এবং মাসিক জিংয়াসেং আয়োজন করা) ৩। মণ্ডলীতে যারা খুবই গরীব তাদেরকে আর্থিক সহায়তা করা (চিকিৎসা, খাদ্য ও বাস্থান ব্যবন্থা) সহায়তা  এবং ৫। দুর্ঘটনা কবলিত খ্রিস্টভক্তদের তাৎক্ষনিক সহায়তা করা। 

মানুষের চোখে যখন সব কিছু নিঃশেষ বলে মনে হয়, ঘৃণা ও মৃত্যু যে মুহূর্তে বিজয় লাভ করে, সে মুহূর্তেই যীশুখ্রিষ্ট  আসেন তার রাজ্যের অধিকার গ্রহণ করতে। ক্রুশের মধ্যদিয়ে যীশুখ্রিষ্টের  মৃত্যু সুস্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তার রাজ্য এজগতের নয়। মানবপ্রেমের মধ্যদিয়ে পাপ থেকে মানুষকে উদ্বার করার জন্য যে মুহূর্তে যীশুখ্রিষ্ট  তার জীবন বিসর্জন দিলেন সেই মুহূর্তে থেকেই যীশু খ্রিষ্টের রাজত্ব শুরু হয়।

সেই বিশ্বাস নিয়ে খাসি খ্রিষ্টান ক্যাথলিক ধর্মাম্বলী ভাই-বোনরা রাজাধিরাজ যীশু খ্রিষ্টকে রাজা হিসেবে মেনে শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরা মন নিয়ে উৎযাপন করছে  এই বছর খ্রিষ্ট  রাজা পর্ব জিংয়াসেং।

 

Add new comment

9 + 10 =