গারো জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় ধর্মগুরু ও পিতৃতুল্য ধর্মযাজক ইউজিন হোমরিক, সিএসসি‘র মহাপ্রয়াণ

জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক কিন্তু বাংলার মাটিতে মিশে আছে তার হাজারো অবদান । যার মৃত্যুতে শোকের ছায়া আজ বাংলাদেশের গারো অঞ্চল গুলোতে। জীবনের ৬০ বছরেরও অধিক সময় মধুপুর বনের গারো জাতিগোষ্ঠীর সাথে কাটিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন গারো জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় ধর্মগুরু ও পিতৃতুল্য ধর্মযাজক; তিনি হলেন ফাদার ইউজিন হোমরিক, সিএসসি।

বিদেশী নাগরিক হয়েও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সনদ, পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন মানবসেবার তরে।

১৯৫৬ - ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ এই  ৩ বছর ঢাকার নবাবগঞ্জের গোল্লা ধর্মপল্লীতে কাজ করেন এবং পরে ময়মনসিংহ শহর ও হালুয়াঘাটে বদলি হন।

বাংলাদেশে এসেই নটর ডেম কলেজের বাংলার অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ আবদুল হামিদের কাছে বাংলা ভাষার পাঠ নেন। দায়িত্ব পালন করেন  সহকারী পালক পুরোহিত হিসেবে ।

আর্চবিশপ গ্রেনার সিএসসি’র অনুরোধে জলছত্র গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন কর্পোস খ্রিস্টি বা খ্রীষ্টদেহ ধর্মপল্লী । ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি লক্ষ্য করেন পিছিয়ে পরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর  জীবনযাত্রা। আর সেই থেকেই তিনি কাজ করেন তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে বাবুল নকরেক’র এক সাক্ষৎকারে ফাদার হোমরিক বলেছিলেন “আমি মনে করি আমার জীবন স্বার্থক এই মান্দিদের মধ্যে থাকতে পেরে।  আমি প্রথমে জলছত্র গ্রামে আসি। গ্রামের মধ্যে কোন ল্যাট্রিন ছিল না। কুয়ার পানি পান করেছি। গায়রা-টেলকি গ্রামে গেলাম, সেখানে একজন আচ্চু গ্লাসে করে আমার জন্য পানি নিয়ে আসলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম : আচ্চু জলসিদ্ধ করেছ? আচ্ছু বলল : হ্যাঁ করেছি। আমি বললাম আবার কর । রাত্রিতে আচ্চু আমাকে কুয়ার কাছে নিয়ে গেল। সেখানে ব্যাঙ ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম : আচ্চু ব্যাঙের পায়খানা তোমরা খাইতেছ। আচ্চু বলল, হ্যাঁ, খুব ভালো লাগে। তারপর আসতে আসতে টিউবওয়েলের কাজ করেছি।”

পিছিয়ে থাকা এই মান্দি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে তিনি বনের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে তোলেন ৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জলছত্র এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন কর্পোস খ্রিস্টি উচ্চ বিদ্যালয় এবং পীরগাছায় প্রতিষ্ঠা করেন সেন্ট পৌলস উচ্চ বিদ্যালয়। মান্দি ছেলেদের জন্য ২টি ছাত্রাবাস ও মান্দি মেয়েদের জন্য ২টি ছাত্রীবাস স্থাপন তার অনন্য কীর্তি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিশুদ্ধ পানির অভাব দূরীকরণে তিনি কূপ, নলকূপ ও গভীর নলকূপ স্থাপন করেন।

মান্দি সম্প্রদায়ের সার্বিক মুক্তির জন্য তিনি সত্যিকার অর্থেই মুক্তির অগ্রদূত। শুধু আদিবাসীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নই নয় সেই সঙ্গে মান্দি (গারো) সম্প্র্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি রক্ষায় নিরলস পরিশ্রমে করেছেন ফাদার হোমরিক। মান্দি নাচ, গান, সেরেনজিং রেরে গ্রিকা, গোরিরোওয়া পরিবেশনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় কাজ করে গেছেন।

ফাদার ইউজিন ই. হোমরিকের, সিএসসি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমেরিকান নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন । এরপর ওয়াশিংটন ডিসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছর মেয়াদি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। খ্রিস্টধর্মের পাশাপাশি ইসলাম, বৌদ্ধ ও হিন্দু র্ধমের ওপর বিশদ জ্ঞান অর্জন করেন। যাজকীয় অভিষেক গ্রহণ করেন ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ফাদার আনজুস সিএসসি-এর কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মানবসেবী ইউজিন ই. হোমরিকের চলে যান নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে অবস্থান কালেই তিনি করোনাতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময়  ২৬ জুলাই রোববার সকাল আটটায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ফাদার হোমরিকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মধুপুরের গারো সমাজের মাঝে। তার মৃত্যূতে মধুপুরের জলছত্র ধর্মপল্লীর সহ গারো অঞ্চলের অনেক স্থানে আয়োজন করা হয় ফাদার হোমরিকের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা। অনেকেই তার মৃত্যু শোক প্রকাশ করেছেন ও তার আত্মার কল্যান কামনা করেছেন।- রিপন আব্রাহাম টলেন্টিনু

তথ্য সহযোগিতা: চম্পা বর্মন।

 

Add new comment

2 + 0 =