স্মৃতিচারণে নজরুল

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জৈষ্ঠ্য বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। ছেলেবেলায় তাঁর নাম ছিল দুঃখু মিয়া। 

 

ছোট থেকেই নজরুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জ সিয়ারসালে রাজ হাইস্কুলে তিনি ভর্তি হন । নজরুল বারো বছর বয়সে লেটোর গানের দলে যোগ দেন। সেখান থেকে তিনি সামান্য কিছু রোজগার করতেন। এরপর তিনি আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি নেন। এখানে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে সৈনিক হয়ে প্রথম বিশ্ব মহাযুদ্ধে যোগদান করেন। নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার এখানেই ইতি ঘটে। বেঙ্গলি রেজিমেন্টে সৈনিক হিসেবে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর কাব্য সাধনায় তিনি পুরোপুরি নিয়োজিত হন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত নবযুগ, লাঙল ও ধূমকেতু পত্রিকা। পত্রিকাগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম খুব অল্প সময় সাহিত্য সাধনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার মধ্যেই তিনি রচনা করেছিলেন অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, চক্রবাক, দোলনচাঁপা, ফণীমনসা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ এবং কুহেলিকা, মৃত্যুক্ষুধা প্রভৃতি উপন্যাস। তিনি প্রায় দুই হাজারের মতো গান রচনা করেছেন। তাঁর গানের সুরের বৈচিত্র্য আমাদের মুগ্ধ করে। মানুষ এখনও শ্রদ্ধা সহকারে তার গান গেয়ে থাকেন এবং শুনে থাকেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গুরুদেব বলে মানতেন।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে বয়সের ব্যবধান বিস্তর হলেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল মধুর। একজন সঞ্চয়িতার কবি। আরেকজন সঞ্চিতার কবি। ১৯১৯ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে নজরুলের প্রথম কবিতা ছাপা হয়। ১৯২০ সাল থেকে নজরুল পুরোপুরি সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ‘মুক্তি’। কিন্তু যে কবিতা তাঁকে খ্যাতি এনে দেয় তার নাম ‘বিদ্রোহী’। পরবর্তীকালে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।

 

১৯২৩ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে কবি সম্বোধন করে তাঁর বসন্ত নাটক উৎসর্গ করেন। এর থেকেই বোঝা যায় দুজনের ভেতরে সম্পর্কের নৈকট্য কতটা গভীর ছিল। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একবার নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাই নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা তো নগণ্য, স্বয়ং গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।’

 

তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স ৬০ ও নজরুল ইসলামের ২২। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভা। নজরুল সভাকক্ষে ঢুকেই সোজা মঞ্চে উঠে বিশ্বকবিকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন। মঞ্চ থেকে নামার মুখেই রবীন্দ্রনাথ খপ করে নজরুলের হাত ধরে টানলেন।  রবীন্দ্রনাথ বলেন, “না নজরুল, তুমি নিচে নয়, তুমি এই সভায় আমার পাশেই বসবে।“ মঞ্চে ৬০ বছরের বিশ্বকবির পাশে ২২ বছরের বিদ্রোহী কবি বসলেন। 

 

নজরুল তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতুতে জানিয়েছিলেন, ‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয় এবং দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি, তা দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনী।’ তাই ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতায় পত্রিকার নামের নিচেই রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী :- “কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু। আধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন। অলক্ষণের তিলক রেখা, রাতের ভালে হোক না লেখা, জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন।“

 

১৯২১ সালে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম শান্তিনিকেতনে যান। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের তিন ঘণ্টার ট্রেন ভ্রমণে গীতাঞ্জলির সব কবিতাই একটার পর একটা সবাইকে শুনিয়ে দেন নজরুল। সেটার জন্য তাঁর বইয়ের সাহায্য লাগেনি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব কবিতাই তাঁর মুখস্থ থাকত।

 

‘আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি রচনা করে তিনি ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গ করেছিলেন তাঁর ধূমকেতু পত্রিকাতে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা ছাপা হওয়ার পর রাজদ্রোহের অপরাধে কবিকে এক বছর আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে কারা বরণও করতে হয় এবং উক্ত ধূমকেতু পত্রিকাটিকে ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করেন। নজরুল এতে বিশেষ আনন্দ পান। সেই উল্লাসে তিনি কারাগারে বসে রচনা করেন ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে নজরুলকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, ‘গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক, আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ।’ অর্থাৎ ‘অনশন ভঙ্গ কর, আমাদের সাহিত্যের প্রয়োজন তোমাকে।'

 

১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নজরুল প্রকাশ করলেন নতুন পত্রিকা লাঙল। এবারেও লাঙল-এর সূচনায় থাকলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন : ধর হাল বলরাম/ আন তব মরু-ভাল হল/ বল দাও ফল দাও স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।

 

এরই মাঝে নজরুল ইসলাম কবিতা ও গানের অনেকগুলো বই নিয়ে বের করলেন সঞ্চিতা। উৎসর্গ বাক্যে লিখলেন, ‘বিশ্বকবি সম্রাট শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু।’

 

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে ১৯২৩ সালে আর নজরুল রবীন্দ্রনাথকে বই উৎসর্গ করেছিলেন ১৯২৮ সালে।

 

১৯২৯ সালে কলকাতা অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে সম্মাননা জানানো হয়। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে নজরুলকে সভাপতির পদে সমাসীন করে সম্মান দেখানো হয়। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রদান করে। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে তাঁকে ডি.লিট উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। 

 

১৯৪২ সালে কবি মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হলেও সুস্থ হননি তিনি। এরপর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্বাক।

 

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় অসুস্থ কবিকে ঢাকায় আনা হয়। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থানকালে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। প্রতিবছরই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে সবাই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। 

 

এপার ওপার দুই বাংলার গর্ব নজরুল। বাঙালির প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তার সৃষ্টির দ্বারাই বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব পেয়েছেন। বাঙালি জাতি চিরকাল তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর সাহিত্য যুগ যুগ ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আমাদের প্রেরণা জোগাবে। নজরুল শুধু একটি সময়ের কবি নন। তিনি সব সময়ের, সব মানুষের কবি।

আজ মহৎজীবন অনুষ্ঠানে আমরা শ্রদ্ধা জানাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে একটি প্রতিবেদনে।

আর এই প্রতিবেদনটি পড়ে ভালো লাগলে অবশ্যই Like, Comment ও Share করবেন আপনার facebook Wall এ যাতে আপনার বন্ধুরা এই বিষয় জানতে পারে।

Please Like, Comment and Share this Program for others to view.

Please Visit our Website: https://bengali.rvasia.org

Facebook: http://facebook.com/veritasbangla YouTube: http://youtube.com/veritasbangla Twitter: https://twitter.com/banglaveritas Instagram: http://instagram.com/veritasbangla 

Download Radio Veritas Asia Mobile App on:

Google Play: https://bit.ly/GooglePlayRVAmobileAPP

App Store: https://bit.ly/AppStoreRVAmobileAPP

#rvapastoralcare #RadioVeritasAsia #RVA_BengaliService #RVASocialMedia2018 #4thRvaOnlineTraining #rva #brbc #মহৎ_জীবন #greatlifes #Atanu_Das #অতনু_দাস #KajiNajrulIslam #kajinajrulislam #কাজী_নজরুল_ইসলাম

Add new comment

3 + 11 =