পোপ ফ্রান্সিস এর “চলো স্বপ্ন দেখি” গ্রন্থের সারকথা

বিশ্ব ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস, করোনা ভাইরাস মহামারির সময় কিছুটা অবসর যাপনের মধ্যে একটি বই লিখেছেন, যে বইটি সম্প্রতি Let Us Dream বা “চলো স্বপ্ন দেখি” নামে প্রকাশিত হয়েছে। “চলো স্বপ্ন দেখি” গ্রন্থে পোপ কীসের জন্য স্বপ্ন দেখতে বলছেন ? তিনি শুরুতেই বলেছেন, “একটা সুন্দর ভবিষ্যত পথের স্বপ্ন দেখতে হবে।” তাঁর অভিজ্ঞতা হলো- অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সমাজে ‘নিষ্ঠুরতা ও অন্যায্যতা’ আরোও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে তাঁর ভাষায় এটাও বলার মতো যে, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য অনেকের দানশীলতা, সৃজনশীলতাও তিনি দেখতে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি উদ্ধার করার জন্য যেমন প্রয়াস রয়েছে তেমনি রয়েছে গ্রহটাকেও উদ্ধার করার প্রয়াস। কোভিড- ১৯ সম্পর্কে তাঁর প্রথম মন্তব্য- “মহামারির যন্ত্রণা যেনো বৃথা-ই যন্ত্রণা না হয়।” পোপ এই মহামারি থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন। আসলে যে মূল বিষয়টি পোপ বলতে চেয়েছেন, তা হলো, “আমাদের অবশ্যই এবং আমরা যেভাবে পারি, বিশ্বটাকে নিরাপদ, নির্মল, স্বাস্থ্যকর রাখা- এবং তা সবার জন্য নিশ্চিত করা।” 

নাতিদীর্ঘ “চলো স্বপ্ন দেখি” পুরো গ্রন্থটি মোট তিনটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম অংশটির মূল বিষয় হলো, , A Time to See বা একটি দেখার সময়। তিনি মনে করেন, আমাদের প্রথমেই দেখতে হয়- কী ধরণের সমস্যা/সংকট আমাদের  সামনে রয়েছে এবং সংকটগুলো আমাদের কী বলতে চায়। যদি সংকটগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, তবে তা আমাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, তা কীভবে মোকাবেলা করা হয়- প্রথমত: নিজের জন্য এবং সঙ্গে বিশ্বের কল্যাণে। পোপ বলন, “সংকট আমাদের বাছাই করার দাবি রাখে- হয় আমরা অতীতের পথে ফিরে যাবো- যা আমাদের জন্য তৈরি করবে পুনরায় এক মহা সংকট; অথবা, আমাদের পরিবর্তন করার সাহস নিয়ে নেমে পড়তে হবে, সংকটের উর্ধ্বে ওঠে  ভালো হওয়ার পথে।” পোপ ফ্রান্সিস তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, “ আমার জানা অনেকেই অপেক্ষা করছেন এই মহামারি কেটে যাক এবং তারা আবার আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে- এই আশায়। যার অর্থ হলো, আগে যা ছিলো, তার পরেও তাই থাকলো।” এই ধারার লোকদের পোপ সমালোচনা করে বলেন, “মহামারির কারণে যে কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়েছে, তা তাহলে বৃথাই গেলো- যদি করোনা ভাইরাস মহামারিকালে আমরা সাহসিকতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ভিত্তি বদল করতে না পরি।”

পোপ ফ্রান্সিস বলেন, “মানুষ বর্তমানে যেভাবে তাদের কর্ম বিনিয়োগ করছেন, তা আগের থেকে কোনো তফাৎ নয়।” তিনি বলেন, “বিশ্ব নেতারা এখানে সেখানে নতুন করে কর্মযজ্ঞ বিনিয়োগ ও বিন্যাসের কথা বলছেন- যা সবই পূর্ব পদ্ধতি থেকে ভিন্ন কিছু নয়।” তার মানে, তিনি “বিশ্বাস করেন” তারা যা নিশ্চিতভাবেই  করতে চান- তার কোনো পরিবর্তন হবে না। পোপ বলেন, “আমি নিশ্চিত যে, এটা আরোও বড় ধরণের ব্যর্থতা যা সমাজে আরোও বিস্ফোরণের আগুনই শুধু জ্বালাবে।”    ।

“চলো স্বপ্ন দেখি” গ্রন্থটির দ্বিতীয় অংশকে বলা যেতে পারে A Time to Choose  বা একটি বাছাইয়ের সময়। পোপ সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও ভাববৈশিষ্ট্য সংকটের বুনিয়াদ রচনা করেছে বা সংকট যতোটুকু হতো তার চেয়েও অধিক সংকটময় ক’রে তুলেছে। তিনি বলেন, বিশ্বের গোটা অর্থনীতি লাভ লোভের কারণে আচ্ছন্ন বা বন্দি হয়ে আছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ, রাজনীতিবিদগণ কর্ণপাত না করে ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সমাজে ভয়ের ইন্ধন যুগিয়েছে। পোপ স্মরণ ক’রে দিয়ে বলেন, “একজন খ্রিস্টানের প্রথম কাজ হলো অন্যের সেবা করা, বিশেষ করে যারা গরিব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, তাদের।” পোপ আমাদের স্মরণ ক’রে দিতে চান যেনো আমরা একই ভুল পুনর্বার না করি। তিনি বলেন, “আমাদের সামনে যদি এরূপ ইচ্ছা থাকে, জীবন রক্ষা না অর্থনীতির পুনরুদ্ধার- তাহলে কোন্টা বাছাই করবো ?” এমন ক্ষেত্রে পোপ মনে করেন, মন্দাঘটিত বিশ্বের অর্থনীতি নিয়ে যদি এগুতে চাই, তাহলে এমনটা গ্রহণ করতে হবে যেটা মানবজাতি এবং সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যথায়, আমাদের ত্যাগস্বীকার ক্রমশ:ই চলতে থাকবে।

“চলো স্বপ্ন দেখি” গ্রন্থটির তৃতীয় অংশকে পোপ বলেছেন, A Time to Act বা একটি কাজের সময়। পোপ, মানব জাতির জন্য উত্তম বিশ্ব গড়ে তোলার নিমিত্তে একটি কর্মপরিকল্পনা বা নক্শা উপস্থাপন করেন, যে নতুন কর্মপরিকল্পনা বা নক্সার মূল খন্ডে রাখেন দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং এই ধরণী মাতাকে। পোপ তাঁর চলো স্বপ্ন দেখি গ্রন্থে, আগেকার প্রকাশিত সর্বজনীন পত্রে উল্লেখিত কিছু ধারণা যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই বিবেচনা ক’রে নির্ণয় করতে হবে, মাতৃতূল্য ধরণী রক্ষা এবং অর্থনীতির জন্য গৃহিত নক্শার মধ্যে দূরত্ব কতোটুকু। তিনি বলেন, “অর্থনীতির পুর্নগঠন যেমন তৈরি করে চলেছে অস্থিরতা, অনাচার- তেমনি প্রকৃতিক মধ্যে তৈরি করে চলেছে ভারসাম্যহীনতা।”

পোপ ফ্রান্সিস তাঁর বিভিন্ন পত্রে এবং বাণীতে বাজার অর্থনীতিকে একটি অপব্যবহার তৈরির কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এটি এক ধরণের ক্ষরণ যা কোনো কাজে আসবে না। তিনি লিখেছেন, কর্মের উদ্দেশ্য এবং কারণ হ’তে হবে- মানব মর্যাদার মূল লক্ষ্য। কিন্তু কর্ম বৃহত্তর কল্যাণের জন্য রক্ষা না হয়ে তা  হয়ে উঠেছে মাত্র উৎপাদন, লাভের হিসাব। কিন্তু বাস্তবে যা হওয়া উচিৎ ছিলো, তা হলো- বাজার অর্থনীতির জন্য যা ভালো, তা যেনো ভালো হয় সমাজের জন্যও। কিন্তু তাঁর মতে, আসলে তা না হয়ে বাজার অর্থনীতি তৈরি করে চলেছে অন্যায্যতা এবং মারাক্তভাবে ধ্বংস করে চলেছে বিশ্ব প্রকৃতিকে। মানুষের কাছে পূঁজি বা মূলধন যখন আরাধ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষকে দাসে পরিণত করা হয়, গরিব শ্রেণি বিতাড়িত হয় এবং ধরণীর জন্য সবকিছু আরোও বিপদজনক হয়ে ওঠে। পোপ তাঁর বিভিন্ন বাণীতে  বরাবরই বলে আসছিলেন, সমাজে যে অসমতা বিরাজ করছে- সেই সম্পর্কে। তিনি বলেন, সামাজিক অধিকার উপলদ্ধি না করতে পারা একটা বড় ব্যর্থতা, যে কারণে অর্থনীতির সুষম বন্ঠন থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলতে চান, “সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অসমতা বিস্ময়াবহরূপে বেড়ে যাওয়া, একবিংশ শতাদ্ধির সমাজে বিদ্যমান বহু অনিষ্টপাতের মূল শিকড়।” 

পোপ ফ্রান্সিস বলেন, “সংকট উত্তরণের জন্য- আমাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে দেখতে হবে; উত্তমকে বাছাই করতে হবে; এবং সঠিক উপায়ে কাজ করতে হবে।”

Add new comment

3 + 13 =