পোপ ফ্রান্সিসের বিশ্ব শান্তি দিবসের বাণী - ২০২২

ছবি : সংগৃহীত

প্রতি বছর পোপ মহোদয় বিশ্ব মন্ডলীর সকল ভক্তদের জন্য একটি শান্তির বার্তা দেন। এবছরের শেষ প্রান্তে এসে পোপ ফ্রান্সিস আগামী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দের জন্য যে বার্তাটি দিয়েছেন তা হচ্ছে – সংলাপ, শিক্ষা ও কাজ যার মধ্য দিয়ে আরো বেশী নারী-পুরুষ, নম্র ও শান্তভাবে প্রতিদিন শান্তির বাহক ও দক্ষ কারিগর হতে পারেন।  

গত ২১ ডিসেম্বর ভাটিকান থেকে "৫৫তম বিশ্ব শান্তি দিবস" উপলক্ষ্যে পোপের বাণীটি প্রকাশ করেন। প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারী এই "বিশ্ব শান্তি দিবস" পালিত হয়। এই দিনের জন্য পোপ মহোদয় একটি বাণী দেন। 

আগামী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দের জন্য বাণীটি হচ্ছেঃ "বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ, শিক্ষা এবং কাজ –স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার যন্ত্র"।  

পোপ বলেন, তিনি বুঝতে পারেন যে দু:খজন্কভাবে অসংখ্য নারী-পুরুষ বাস্তবে এই শান্তির পথ থেকে অনেক দূরে রয়েছে। কারণ নানা দেশে যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ূ পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং বিশ্বে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব অব্যাহত। তিনি বলেন, "বিশ্বে এই পরিস্থিতির মধ্যে দরিদ্রদের কান্না ও পৃথিবীর কান্না ক্রমাগত ন্যায্যতা ও শান্তির আবেদন জানাচ্ছে"। 

পোপ বলেন, "যুগে যুগে উর্ধ্ব হতে উপহার শান্তি এবং তার পারষ্পরিক সহভাগিতার ফল" । অতএব সকলে মিলে একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য কাজ করতে হবে, আর তা হতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, পরিবেশ এবং সর্বশেষ বিশ্বমানবের সাথে এই শান্তির লক্ষ্যে কাজ করা। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পোপ মহোদয় তিনটি পথের উল্লেখ করেন। 

প্রথমত: বর্তমান বিভক্ত প্রজন্মের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নরে লক্ষ্যে সংলাপ শুরু ও তা অব্যাহত রাখা।

দ্বিতীয়ত: ব্যক্তি পর্যায়ে, পরিবারে ও সমাজে স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও উন্নয়নের অন্যতম উপাদান হিসেবে শিক্ষা।  

তৃতীয় ও সর্বশেষ মানুষের শ্রমকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে তার স্বীকৃতি উপলব্দি করা। 

পোপ মহোদয় বলেন, সামাজিকভাবে এই তিনটি অপরিহার্য উপাদানকে চুক্তি হিসেবে গণ্য করা যাতে শান্তির প্রতিটি প্রকল্প অমূলক হয়ে না যায়। 

পোপ ফ্রান্সিস অতপর এই তিনটি টুল-এর বিস্তারিত আলোচনা করেন। পোপ বলেন, যেহেতু কোবিড-১৯এর প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে,সেহেতু, প্রজন্মের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে আলোচনার মাধ্যেমে সহভাগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

"সমস্ত সৎ সংলাপ, একটি সঠিক এবং ইতিবাচক মতামত বিনিময় ছাড়াও, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মৌলিক আস্থার দাবি রাখে। এই পারস্পরিক বিশ্বাস কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায় তা আমাদের শিখতে হবে," তিনি বলেছিলেন।

এটি বিশেষত: গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রজেন্মের মধ্যে – স্মৃতির রক্ষক হিসেবে বয়স্কদের ও যারা ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেই তরুণদের মধ্যে মৌলিক আস্থা এবং বিশ্বাস স্থাপন করা। 

"আমাদের বর্তমান সংকটগুলো আসলে আন্ত:প্রজন্মগত অংশীদারিত্বের জরুরী প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে" এবং এই অবস্থা আমাদের জানান দিচ্ছে যে সাধারণ বাড়ীর যত্ন নিতে হবে এবং এটাও নির্দেশ দেয় যে বর্তমান পরিবেশ "আগামী প্রজন্মের উপর ঋনের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে"। 

"শান্তির মূল চালিকা হিসেবে শিক্ষাদান ও শিক্ষাক অপরিহার্য" উল্লেখ করে পোপ বলেন, "অখণ্ড মানব উন্নয়নের প্রচারের প্রাথমিক উপায়" এবং এটি "শান্তি রক্ষা এবং প্রচারের জন্য অপরিহার্য প্রতিটি ব্যক্তিকে আরও মুক্ত এবং দায়িত্বশীল" করে তোলে ।

পোপ সামরিক ব্যয়ের বৈশ্বিক বৃদ্ধির নিন্দা করে বলেন যে, "অর্থনৈতিক নীতি তৈরী করতে  শিক্ষা এবং অস্ত্রের জন্য ব্যয়ীত সরকারি তহবিলের অনুপাতকে উল্টানোর এটাই হচ্ছে প্রতিটি সরকারের জন্য উপযুক্ত সময়"।

তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণের একটি সত্যিকারের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা কেবলমাত্র জনগণ ও জাতির উন্নয়নের জন্য প্রমাণিত উপকার হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল, অবকাঠামো, জমির যত্নের জন্য আরও ভালভাবে ব্যবহৃত আর্থিক সংস্থানগুলিকে মুক্ত করা। পোপ ফ্রান্সিসের দেওয়া তৃতীয় পথটি "শ্রম তৈরি করা এবং শান্তি নিশ্চিত করা" এর উপর নির্ভর করে"।

"শ্রম হচ্ছে শান্তি স্থাপন এবং তা স্থায়ী করণের একটি অপরিহার্য উপাদান৷ এটি আমাদের অভিব্যক্তি এবং উপহার; তবে এটি আমাদের প্রতিশ্রুতি, স্ব-বিনিয়োগ এবং অন্যদের সাথে সহযোগিতার একটি অভিব্যক্তি, যেহেতু আমরা সর্বদাই কারো সাথে বা কারো জন্য কাজ করা। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সুষ্পষ্ট যে, কর্মক্ষেত্রটি আমাদের আরও বাসযোগ্য এবং সুন্দর বিশ্বের প্রতি আমাদের অবদান রাখতে সক্ষম করে," পোপ বলেছিলেন।

কোভিড -19 মহামারী নেতিবাচকভাবে শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করেছে, যা ইতিমধ্যে অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, পোপ বলেন। বরাবরের মত এর ফলে দরিদ্ররাই সবচেয়ে বেশী ভুক্তভোগী। 

"অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে সঙ্কটের প্রভাব, যেখানে প্রায়শই অভিবাসী শ্রমিকরা রয়েছে সেটা ধ্বংসাত্মক হয়। পরবর্তীগুলির অনেকগুলিই জাতীয় আইনেও স্বীকৃত নয়; সেখানে তাদের অস্তিত্বও স্বীকৃত নয়। তারা এবং তাদের পরিবারগুলি অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় বাস করে, তারা বিভিন্ন ধরনের দাসত্বের শিকার হয় এবং তাদের রক্ষার জন্য বা তাদের কল্যাণে কোন ব্যবস্থাও নেই," তিনি বলেন।

এই বিষয়ে পোপ ফ্রান্সিসের দৃষ্টিভঙ্গি দুটি। একদিকে, কাজের প্রয়োজনীয়তা, এই পৃথিবীতে জীবনের অর্থ, এগিয়ে যাওয়ার পথ, ব্যক্তিগত সিদ্ধিলাভ এবং সমাজে অবদান রাখার সুযোগ।  

অন্যদিকে, "শ্রমিকদের জন্য শালীন এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের পরিবেশের তৈরী করে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য প্রচার করা যে, ”অর্থনৈতিক লাভই একমাত্র নির্দেশক মাণদন্ড নয়"। 

তিনি বলেন, সমাজে সচেতন নারী-পুরুষের ভূমিকা এবং যারা মানুষের মানবিক মর্যাদাকে সম্মান করে এমন স্থানে কাজ করে পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়, তারা শান্তির কারিগর হয়ে আন্তঃপ্রজন্মের সংলাপ, শিক্ষা এবং কাজের পথে একসাথে হাঁটবে, তিনি বলেছিলেন।

"আরও বেশি সংখ্যক পুরুষ এবং মহিলা প্রতিদিন শান্ত নম্রতা এবং সাহসের সাথে, শান্তির কারিগর হতে সংগ্রাম করে, তারা যেন শান্তিদাতা ঈশ্বরের অনুপ্রেরণায় এবং আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়", পোপ ফ্রান্সিস বলেন।

পোপ সাধু ষষ্ঠ পৌল ১৯৬৭ খ্রীষ্টাব্দে বিশ্ব শান্তি দিবস প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দিনটি প্রথম পালিত হয়েছিল ১লা জানুয়ারী ১৯৬৮ খ্রীষ্টাব্দে।  এই দিনটিতে খ্রীষ্ট মন্ডলী মাতা মেরীকে "ঈশ্বরের মা" হিসেবে উদযাপন করেন।- তথ্য : সংগৃহিত

Add new comment

4 + 7 =